বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে ঘাসবিশেষজ্ঞরা কী করছেন
ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপ। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত ও ফুটবলারদের চোখ এখন বিশ্বকাপ ২০২৬–এর তিন সহস্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর দিকে। এই মহাযজ্ঞের নেপথ্যে মাঠের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত উপাদান নিয়ে কয়েক বছর ধরে চলেছে চুলচেরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা। সেটি হলো ফুটবল মাঠের প্রাকৃতিক ঘাস। বিশ্বকাপের মোট ১০৪টি ম্যাচ সবুজ গালিচার ওপর খেলা হচ্ছে। তা নিখুঁত রাখতে বিজ্ঞানীরা আট বছর ধরে মাইলের পর মাইলজুড়ে ঘাস চাষ করেছেন, পানি দিয়েছেন, কেটেছেন এবং বুট জুতা দিয়ে পিষে পরীক্ষা করেছেন।
খেলার মাঠে ঘাসের মান সামান্য খারাপ হলে তা কতটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এর প্রমাণ মিলেছিল ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার আনহেল দি মারিয়া কানাডার ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল নিয়ে যখন গোলের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন ঘাসের ত্রুটির কারণে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলেন না। গোলকিপারকে একা পেয়েও তিনি একটি দুর্বল শট নেন, যা সহজেই আটকে যায়। ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি ও কোচ লিওনেল স্কালোনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আটলান্টার স্টেডিয়ামের সেই অস্থায়ী ঘাসের মাঠকে বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ফুটবলাররা অভিযোগ করেছিলেন, বলটি মাঠে ড্রপ খাওয়ার সময় স্প্রিংবোর্ডের মতো লাফিয়ে উঠছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে এ ধরনের লজ্জাজনক সমালোচনা এড়াতে ফিফা এবার শরণাপন্ন হয়েছিল একদল ঘাসবিশেষজ্ঞ বা টার্ফগ্রাস বিজ্ঞানীর। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির অধ্যাপক জন সোরোচানকে ফিফা এই বিশ্বকাপের ১৬টি স্টেডিয়ামের ঘাস উৎপাদন, স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্টেডিয়াম সম্পূর্ণ ইনডোর বা ছাদযুক্ত ডোম। অধ্যাপক জন সোরোচান বলেন, ‘এটি অনেক বড় একটি মানসিক চাপ। বিশেষ করে ছাদযুক্ত ডোম স্টেডিয়াম নিয়ে আমি সত্যিই খুব চিন্তিত। কারণ, বাইরে সূর্য উঠবে ঠিকই; কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে তো রোদ পৌঁছাবে না। আর উদ্ভিদের বেঁচে থাকার ও বৃদ্ধির জন্য আলো, বিশেষ করে সূর্যালোক সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
অধ্যাপক সোরোচান ও তাঁর সহকর্মী বিজ্ঞানীদের করা ১৭০টির বেশি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার সফল ফলাফল এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাচ্ছে। মাত্র পাঁচ মিলিমিটারের ঘাসের এদিক-ওদিক একটি মাঠের খেলাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। ঘাস যদি প্রয়োজনের চেয়ে সামান্য বড় হয় তবে তা বলের গতি কমিয়ে দেয়, একে বিজ্ঞানের ভাষায় ভেলক্রো ইফেক্ট বলে। নিখুঁত মাপে ছাঁটা হলে তা বলের মসৃণ পাসিংয়ে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নক্সভিলিতে অবস্থিত নিজেদের ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা লাল রঙের বিশেষ মেশিন দিয়ে ফুটবল ছুড়ে মেরে ঘাসের ওপর বলের গতি ও বাউন্স মেপেছেন। স্টিলের তৈরি একটি কৃত্রিম পায়ে ফুটবল বুট পরিয়ে তা দিয়ে ঘাসের ওপর অনবরত লাথি ও মাড়াই দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, যাতে বুটের স্প্রিংগিনেস ও খেলোয়াড়দের ট্র্যাকশন বা মাটির সঙ্গে জুতার গ্রিপ নিখুঁত থাকে। খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়া মারাত্মক ইনজুরি বা আঘাত এড়াতে এবং পিচ্ছিল স্পটগুলো দূর করতেই এই সূক্ষ্ম আয়োজন। এ ছাড়া বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোর ভৌগোলিক বৈচিত্র্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মেক্সিকো সিটি বা মিয়ামির তীব্র আর্দ্র গরম থেকে শুরু করে টরন্টো কিংবা বোস্টনের তীব্র ঠান্ডা সব আবহাওয়াতেই যেন মাঠ একই রকম থাকে, এর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গরম আবহাওয়ার স্টেডিয়ামের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ঘন বারমুডা ঘাস এবং তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য কেন্টাকি ব্লুগ্রাস ও পেরেনিয়াল রাইগ্রাসের মিশ্রণ। ঘাসকে আরও টেকসই করতে এর গোড়ায় কৃত্রিম প্লাস্টিক ফাইবার বা সুতো বুনে দেওয়া হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ট্রে রজার্স বলেন, একই সঙ্গে এতগুলো স্টেডিয়ামের জন্য বিশাল স্কেলে অস্থায়ী ঘাসের মাঠ তৈরি করাটা সত্যিই অনেক বড় এবং উদ্বেগের একটি কাজ।
রজার্স ও সোরোচান দুজনই ঘাসবিজ্ঞানের দুনিয়ায় সেলিব্রেটি। ইনডোর স্টেডিয়ামে ঘাস লাগানোর ইতিহাস প্রথম তৈরি হয়েছিল ১৯৯৪ সালের মার্কিন বিশ্বকাপে। মিশিগানের পন্টিয়াক সিলভারডোম স্টেডিয়ামের ভেতরে কৃত্রিম টার্ফের ওপর প্রথমবারের মতো সফলভাবে প্রাকৃতিক ঘাস বসানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন অধ্যাপক রজার্স, জন সোরোচান তখন ছিলেন তাঁর এক তরুণ ছাত্র। জন নিজ হাতে সেই মাঠের বালু সমান করার কাজ করেছিলেন। ১৯৯৪ সালের সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর রজার্সকে বিশ্বজুড়ে বা ঘাসের গুরু উপাধি দেওয়া হয়। তাঁর ছাত্র সোরোচান তখন থেকেই ইনডোর স্টেডিয়ামে কীভাবে ঘাসকে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়ে পিএইচডি ও গবেষণা শুরু করেন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ডালাস, আটলান্টা ও হিউস্টনের তিনটি প্রধান ডোম স্টেডিয়ামের ঘাস তৈরি হয়েছে কলোরাডোর ডেনভারে অবস্থিত জো উইলকিন্সের বিশাল গ্রিন ভ্যালি টার্ফ কোম্পানির ফার্মে। সেখানে প্লাস্টিকের চাদরের ওপর বালু বিছিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ঘাস চাষ করা হয়েছে, যাতে কাটার সময় এর শিকড় অক্ষত থাকে। এই ঘাসকে সতেজ রাখতে নিয়মিত সার, ছত্রাকনাশক, হিউমেটস, সামুদ্রিক কেল্প ও সিলিকা ব্যবহার করা হয়েছে। কাটার পর ঘাস যাতে গরমে নষ্ট না হয়, সে জন্য কেবল সূর্যাস্তের পর ঘাস কেটে রেফ্রিজারেটেড বা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ট্রাকে করে হাজার মাইল দূরের স্টেডিয়ামগুলোতে পাঠানো হয়েছে। স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পর দিনের আলো না পেলেও সমস্যা নেই, কারণ মাঠের ঠিক ওপর থেকে আলট্রাভায়োলেট বা বেগুনি আলোর বিকিরণ ঘটাতে তৈরি রাখা হয়েছে শক্তিশালী এলইডি গ্রো লাইটস। এই কৃত্রিম আলোই ঘাসকে সতেজ রাখবে।
ফিফা এই বিশ্বকাপের ঘাস গবেষণার পেছনে প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই গবেষণার ফলে শুধু বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতে স্কুল-কলেজের সাধারণ খেলার মাঠের ঘাসের মানও অনেক উন্নত করা সম্ভব হবে।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্টস