যুদ্ধ যেভাবে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্যে অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করে
যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত প্রাণহানি বা অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু পরিবেশের ওপর এর প্রভাব খুব ভয়াবহ এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। বিস্ফোরণের ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ বাস্তুসংস্থানকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের সময় পৃথিবীর নাজুক বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্যে অদৃশ্য ক্ষত তৈরি হয়। এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আবহাওয়ার ওপর বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যুদ্ধের সরঞ্জাম, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড বায়ুমণ্ডলে সালফার ডাই–অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো গ্যাস ছড়িয়ে দেয়। যখন এই গ্যাসগুলো জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে যায়, তখন সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি হয়। পরবর্তী সময় এসব অ্যাসিড বৃষ্টি হিসেবে মাটিতে ঝরে পড়ে। পরিবেশ নীতি ও শাসনবিষয়ক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধকবলিত এলাকায় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার অনেক বেশি। অ্যাসিড বৃষ্টি কেবল গাছপালা, নদী বা প্রাণিকুলের ক্ষতি করে না, এটি মানুষের ফুসফুস ও চোখের প্রদাহের অন্যতম কারণ। এটি যুদ্ধের এমন এক নীরব প্রভাব, যা বছরের পর বছর টিকে থাকে।
যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় ঘন ও বিষাক্ত কুয়াশাও তৈরি হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , ইরাকের বিভিন্ন তেলকূপে আগুন দেওয়ার ফলে যে ঘন ধোঁয়া তৈরি হয়েছিল, তা সূর্যের আলোকেও আড়াল করে দিয়েছিল। এর ফলে পুরো এলাকা ঘন ঝুলকালিতে ঢেকে যায়, যাকে গবেষকেরা যুদ্ধের কুয়াশা বলে অভিহিত করেন। এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন সালফার ডাই–অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এই বিষাক্ত গ্যাস বায়ুর আর্দ্রতার সঙ্গে মিশে দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় এবং স্থানীয় তাপমাত্রায় পরিবর্তন আনে।
আধুনিক যুদ্ধে রাসায়নিকের ব্যবহার বায়ুমণ্ডলের দূষণকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থগুলো বাতাস, মাটি ও পানিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এবং বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আবার বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এই বিষাক্ত পদার্থগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে বৃষ্টির রাসায়নিক গঠন নষ্ট করে দেয়।
যুদ্ধ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সারা বিশ্বের আবহাওয়া বদলে দেয় না, তবে একটি অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করার মাধ্যমে এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। বন উজাড় হওয়া, বায়ু ও পানিদূষণের ফলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক স্বয়ংক্রিয় সংশোধনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে অনিয়মিত বৃষ্টি ও চরম তাপমাত্রার মতো ঘটনা ঘটে।
যুদ্ধ কেবল সীমানা বা প্রজন্মের ক্ষত নয়, এটি আমাদের গ্রহের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর এক বিশাল আঘাত। অ্যাসিড বৃষ্টি থেকে শুরু করে বিষাক্ত কুয়াশা পর্যন্ত প্রতিটি উপাদানই প্রমাণ করে যে যুদ্ধের জয়–পরাজয় কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর মূল্য দিতে হয় প্রকৃতিকেও।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া