আবারও চাঁদের পথে মানুষ, নানা কারণে দেরির মুখে অভিযান

আর্টেমিস–২ মিশনের জন্য তৈরি স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটফাইল ছবি: রয়টার্স

‘আমি যখন চাঁদের বুক থেকে মানুষের শেষ পদচিহ্ন এঁকে বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছি, আমি বিশ্বাস করি, এটি খুব বেশি সময়ের জন্য নয়’, এভাবেই ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ অভিযানের কমান্ডার ইউজিন সারনান চাঁদের বুক থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ভাবছিলেন। তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল ফিরে আসার আশা। তবে ইতিহাস অন্যভাবে এগিয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মানুষ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে আর কোথাও যায়নি।

অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। নাসার আর্টেমিস–২ মিশনের মাধ্যমে চার নভোচারী আবারও চাঁদের পথে পাড়ি দিচ্ছেন। এরই মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর ঐতিহাসিক অভিযান আর্টেমিস–২ নিয়ে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা—নাসা। আশা করা হয়েছিল মার্চেই মহাকাশচারীরা চাঁদের উদ্দেশে রওনা দেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের কারিগরি ত্রুটির কারণে নাসা দ্বিতীয়বারের মতো এই অভিযান স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।

নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, মার্চের মধ্যে রকেটটি উৎক্ষেপণের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এর ফলে রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে গঠিত চার সদস্যের নভোচারী দলটিকে অন্তত আগামী ১ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

২০২৭ সালের মধ্যে চাঁদে অবতরণের জন্য নাসা ইতিমধ্যেই স্পেসএক্সের সঙ্গে ২৯০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে। কিন্তু এসএলএস রকেটের এই বারবার বিলম্ব পুরো আর্টেমিস প্রোগ্রামকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে মেক্সিকোর হিউস্টনে কোয়ারেন্টিনে থাকা চার মহাকাশচারী কবে নাগাদ পৃথিবীর মাটি ছাড়তে পারবেন, তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। নাসা প্রশাসক আইজ্যাকম্যান বলেন, মানুষের এই হতাশ হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে নাসার যে দলটি দিন–রাত এক করে কাজ করছে, তাদের চেয়ে বেশি হতাশ আর কেউ নেই।

১০ দিনের এই গভীর মহাকাশ অভিযানটি নতুন মহাকাশযান, নতুন অংশীদারত্ব ও চন্দ্রাভিযানের এক নতুন যুগের সূচনা করবে। অ্যাপোলো যুগের সমাপ্তি ঘটেছিল মূলত রাজনীতি, বিজ্ঞান ও অত্যধিক খরচের কারণে। তখনকার মার্কিন বিজ্ঞানীরা চাঁদকে শুষ্ক ও ভূতাত্ত্বিকভাবে মৃত বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালে ভারতের চন্দ্রযান–১ অভিযানের মাধ্যমে চাঁদে পানির অণু আবিষ্কৃত হওয়ার পর পুরো পটভূমি বদলে যায়। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলে বরফ আকারে পানির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতি গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম।

আর্টেমিস–২ অভিযানে কোনো চন্দ্র অবতরণ হবে না; বরং এটি চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে। এই অভিযানের চার নভোচারী ইতিহাসের পাতায় নতুন কিছু রেকর্ড যোগ করতে যাচ্ছেন। এই অভিযানের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান মার্কিন নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ বৈমানিক। পাইলট ভিক্টর গ্লোভার হতে যাচ্ছেন চাঁদে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। অভিযান বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী হিসেবে চন্দ্র অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। মহাকাশে দীর্ঘতম সময় কাটানোর রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। অভিযান বিশেষজ্ঞ জেরেমি হ্যানসেন—কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির এই নভোচারী প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য নাগরিক হিসেবে চাঁদের পথে রওনা দেবেন।

নাসার শক্তিশালী রকেট এসএলএস ও ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে নভোচারীরা যাত্রা করবেন। তাঁরা চাঁদকে একবার প্রদক্ষিণ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এটি মূলত সামনের পরিকল্পিত মানববাহী চন্দ্র অবতরণের একটি মহড়া। এই মিশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালানো হবে। আরচার নামের পরীক্ষায় গভীর মহাকাশে নভোচারীদের ঘুম, মানসিক চাপ ও পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে গবেষণা করা হবে। বিকিরণ ও একাকিত্বের প্রভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হবে। ভ্যান অ্যালেন বেল্টের বাইরে মানুষের হাড়ের মজ্জার কোষের ওপর তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব পরীক্ষা করতে অর্গান–অন–এ–চিপ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করা হবে।

অ্যাপোলোর তুলনায় আর্টেমিস মিশনের প্রযুক্তি বহুগুণ উন্নত। ওরিয়ন মহাকাশযান অ্যাপোলোর কমান্ড মডিউলের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত। অ্যাপোলো যেখানে জ্বালানি কোষের ওপর নির্ভরশীল ছিল, ওরিয়ন সেখানে সৌর প্যানেল ব্যবহার করছে। এ ছাড়া অ্যাপোলোর কম্পিউটার মেমোরির তুলনায় ওরিয়নের রয়েছে কয়েক শ গুণ বেশি প্রসেসিং পাওয়ার। যদিও উৎক্ষেপণের আগে রকেটে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি ও লিক ধরা পড়ায় মিশনের সময় কিছুটা পিছিয়ে ২০২৬ সালের মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবু এটি স্পষ্ট যে ইউজিন সারনানের সেই বিদায়ী বার্তাটি অবশেষে সফল হতে চলেছে। মানুষ আবারও চাঁদের পথে যাচ্ছেন। এবার তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার প্রস্তুতি নিয়েই ফিরছেন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া