বদলে যাচ্ছে মশার অভ্যাস
বনজঙ্গল উজাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মশা বিলুপ্ত হচ্ছে না; বরং তারা এমনভাবে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, যা তাদের মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভলুশন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের দ্রুত সংকুচিত হতে থাকা আটলান্টিক ফরেস্টে অনেক প্রজাতির মশা এখন বন্য প্রাণীর বদলে মানুষের রক্ত পান করতে বেশি পছন্দ করছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই নিঃশব্দ আচরণগত পরিবর্তন ডেঙ্গু, জিকা ও পীতজ্বরের মতো রোগের ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্রাজিলের উপকূলরেখা বরাবর বিস্তৃত আটলান্টিক ফরেস্ট একসময় বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল ছিল। বর্তমানে এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অক্ষত রয়েছে। কয়েক দশকের নগরায়ণ ও কৃষিকাজের ফলে বন্য প্রাণীরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকা পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মশারা টিকে আছে এবং মানুষের তৈরি নতুন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। মশারা এই পরিবর্তনের প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা বুঝতে গবেষকেরা রিও ডি জেনিরো রাজ্যের দুটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালান। তাঁরা আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে ৫০টির বেশি প্রজাতির সতেরো শর বেশি মশা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে রক্ত পান করেছে, এমন স্ত্রী মশাগুলোর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়। এদের পাকস্থলীর রক্ত থেকেই বোঝা যায় তারা কোন প্রাণীকে কামড়াচ্ছে।
ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংগৃহীত মশার রক্তের বিশাল অংশ এসেছে মানুষের শরীর থেকে। অন্যদিকে মশার রক্তে বন্য প্রাণীর রক্ত পাওয়ার হার ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ব্রাজিলের ওসওয়াল্ডো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেরোনিমো আলেনকার বলেন, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বনাঞ্চলে অনেক প্রাণীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও মানুষের রক্তের প্রতি এই প্রবল আসক্তিতে মানুষের শরীরে রোগজীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
মশারা নিজের খাদ্যের উৎসের প্রাপ্যতার ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। বন উজাড় হওয়ার ফলে যখন বন্য প্রাণীর সংখ্যা কমে যায়, তখন তাদের চিরাচরিত রক্তের উৎসগুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বন ঘেঁষে গড়ে ওঠা লোকালয়ে মানুষের সহজলভ্যতা তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। গবেষণার সহলেখক সার্জিও মাচাদো ব্যাখ্যা করেন, প্রাকৃতিক হোস্ট বা শিকার কমে যাওয়ায় মশারা বিকল্প উৎসের সন্ধানে বাধ্য হয়। এসব এলাকায় আমরা মানুষ সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য, তাই তারা আমাদের রক্তকেই বেছে নিচ্ছে।
আটলান্টিক ফরেস্ট অঞ্চলে ডেঙ্গু, জিকা, পীতজ্বর, চিকুনগুনিয়া ও মায়ারো ভাইরাসের মতো রোগ ছড়াতে সক্ষম মশার বিচরণ রয়েছে। যখন এই মশা বন্য প্রাণী ও মানুষ উভয়ের রক্ত পান করে, তখন তারা বন ও লোকালয়ের মধ্যে ভাইরাসের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, বনের অবশিষ্টাংশের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি একটি আগাম সতর্কবার্তা। বন রক্ষা ও পুনঃ বনায়ন কেবল পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার পরিণাম বনের সীমানা ছাড়িয়ে সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া