পৃথিবীতে প্রাণের উৎসের ইতিহাস বদলে দিচ্ছে ৩৭৭ কোটি বছরের পুরোনো পাথর
কানাডার উত্তর কুইবেকের বন্য অঞ্চলে হাডসন বের তীরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা পাথরকে প্রথম দেখায় অন্য যেকোনো সাধারণ পাথরের মতোই মনে হবে। কিন্তু নুভুয়াগিত্তুক সুপ্রাক্রাস্টাল বেল্ট নামে পরিচিত এই পাথরগুলোই এখন পৃথিবীর প্রাণের উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা পাল্টে দেওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই অতি প্রাচীন পাথরের স্তরে মাইক্রোস্কোপিক বা আণুবীক্ষণিক টিউবের মতো গঠন এবং হেমাটাইটের নামের একধরনের আয়রন অক্সাইডের তৈরি সূক্ষ্ম ফিলামেন্ট খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো পাথরের গায়ে কোনো সাধারণ আঁচড় নয়, সূক্ষ্ম ফিলামেন্টের সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের আশেপাশে বাস করা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুর সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। যদি এসব সত্যিই জীবাশ্ম হয়ে থাকে, তবে এটি হবে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে আবিষ্কৃত প্রাণের প্রাচীনতম প্রমাণ। এদের বয়স কমপক্ষে ৩৭৭ কোটি বছর।
এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তনের গতির তথ্য দিচ্ছে। সাধারণত ধারণা করা হয়, পৃথিবীর আদি সময়ের অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণের বিকাশ সম্ভব ছিল না। কিন্তু কুইবেকের পাথরের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে পানি জমার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোনো না কোনো জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব তৈরি হয়েছিল। আদি প্রাণের উৎস সন্ধানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃতি অনেক সময় এমন সব গঠন তৈরি করে, যা দেখতে অনেকটা জীবন্ত প্রাণীর মতো মনে হলেও আসলে তা নয়। তাই নিজেদের দাবি প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীদের রাসায়নিক স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
এভিডেন্স ফর আর্লি লাইফ ইন আর্থস ওল্ডেস্ট হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট প্রিসিপিটেটস শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই পাথরের পাশাপাশি গ্রাফাইট এবং অ্যাপাটাইটের মতো নির্দিষ্ট কিছু খনিজ পাওয়া গেছে। এই খনিজ সাধারণত জৈবিক কর্মকাণ্ডের উপজাত হিসেবে তৈরি হয়। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিভিন্ন ফিলামেন্ট আসলে প্রাচীন আয়রন-অক্সিডাইজিং ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি। এসব অতীতে সমুদ্রতলের ভেন্টগুলোর কিনারায় বাস করত। শারীরিক গঠনের সঙ্গে এই সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবেশের যোগসূত্র স্থাপন করে গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন এসব আসলে জীবাশ্ম।
অবশ্য বৈজ্ঞানিক মহলে এই নিয়ে বিতর্কও কম নেই। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে বিভিন্ন পাথর প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। নুভুয়াগিত্তুক বেল্ট নিয়ে গবেষণা যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে সেই আদিম সময়েও প্রাণের বৈচিত্র্য ছিল ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা এখানে একক কোনো জীবাশ্মের বদলে একটি পুরো গোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের চিহ্ন পেয়েছেন। সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় আরও নতুন পাওয়া গেছে। পাথরের ভেতরে আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সালফার এবং আয়রন মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগেই প্রাণ বিভিন্ন ধারায় বিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। যদি এসব সত্য হয়, তবে প্রাণের মূল উৎপত্তি আরও অনেক আগে ঘটেছিল বলে প্রমাণ মিলবে।
এই আবিষ্কার অন্য গ্রহে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রাচীন কানাডার হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে যদি প্রাণ এত দ্রুত বিকশিত এবং বৈচিত্র্যময় হতে পারে, তবে মঙ্গলের ভেজা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখগুলোয়ও একই ঘটনা ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে কুইবেকের এই সব জীবাশ্মকে সম্ভাব্য জীবাশ্ম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া