পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে প্রলয়ংকর সুপার এল নিনো
জলবায়ুর রহস্যময় ও বৈরী আচরণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রকৃতির এক আদিম ও ধ্বংসাত্মক খামখেয়ালিপনার নাম এল নিনো। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা এবার এক চরম আশঙ্কাজনক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ংকর সুপার এল নিনো। নতুন এল নিনো অতীতের এল নিনোর চেয়ে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। আবহাওয়া ও সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতাবৃদ্ধির চেনা প্যাটার্ন এবার এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে চলেছে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো ছিল মানব–ইতিহাসের অন্যতম তীব্র ও ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়। এটি বিশ্বজুড়ে এক মহাদুর্ভিক্ষের জন্ম দিয়েছিল। ক্লাইমেট রিকনস্ট্রাকশন থেকে জানা যায়, সে সময় প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রধান অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। এ সামান্য পরিবর্তনের ফলেই পুরো পৃথিবীর বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়ম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। বিজ্ঞানীদের অনুমান, সে সময় সৃষ্ট তীব্র খাদ্যসংকট, অনাহার ও মহামারির কারণে পৃথিবীর তৎকালীন মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ অকালে মারা গিয়েছিল। আজকের দিনে যদি ঠিক একই ধরনের বিপর্যয় ঘটে, তোহলে বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াবে কমপক্ষে ২৫ কোটিতে।
বর্তমান আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছরের শেষের দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে আসন্ন সুপার এল নিনোটি প্রায় সার্ধশত বছর আগের সেই ধ্বংসাত্মক এল নিনোর চেয়ে শক্তিশালী ও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানী ও ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক দীপ্তি সিং বলেন, ১৮৭০–এর দশকের মতোই একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু বছরব্যাপী তীব্র খরা আবার দেখা দিতে পারে। তবে তখনকার সময়ের সঙ্গে এখনকার মূল তফাত হলো, আমাদের বর্তমান বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর ১৮৭০ সালের তুলনায় অনেকটা বেশি উষ্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে এল নিনো-জনিত চরম আবহাওয়ার রূপ আরও অনেক বেশি মারাত্মক ও ভয়াবহ হবে।
১৮৭৭ সালের সেই সুপার এল নিনো পুরো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। অনেকে একে পৃথিবীর প্রথম প্রকৃত বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয় বলে মনে করেন। সে সময় কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা মৃদু খরা এল নিনোর প্রভাবে তীব্র আকার ধারণ করে এবং মাইলের পর মাইল কৃষিসম্পদ ও ফসল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা পুরোপুরি গায়েব হয়ে যাওয়ায় ভারত ছিল সে সময় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে লাখ লাখ মানুষ তীব্র অনাহারে মারা যায়। অন্যদিকে উত্তর চীনজুড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ শুষ্ক আবহাওয়া, যার ফলে সেখানে ফসলের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ব্রাজিলে নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায় এবং কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর পাশাপাশি আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতেও তীব্র খরা ও ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষের ফলে বিভিন্ন দেশের সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, যা কিছু অঞ্চলে ঔপনিবেশিক বা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি মানুষের স্থানান্তর বা মাইগ্রেশনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং জলবায়ুর ধাক্কার সামনে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা যে কতটা নাজুক, তা সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়।
দুর্ভিক্ষের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরবর্তীকালে ম্যালেরিয়া, প্লেগ, আমাশয়, গুটিবসন্ত ও কলেরার মতো মারাত্মক মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল।
এ আসন্ন বিপদ নিয়ে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট অ্যালবানির বিজ্ঞানী অধ্যাপক পল রাউন্ডা বলেন, বর্তমান বছরের এ পরিস্থিতি ১৮৭৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ইতিহাসের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় এল নিনো ইভেন্ট বা জলবায়ু বিপর্যয় হতে চলেছে। অন্যদিকে বিখ্যাত জলবায়ুবিজ্ঞানী ক্যাথরিন হ্যাহো সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আসন্ন এই এল নিনো মানবসমাজ ও মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও বেঁচে থাকার ওপর এক গভীর ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এল নিনো-সাদার্ন অসিলেশন মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা দুই থেকে সাত বছর পরপর গরম এল নিনো ও ঠান্ডা লা নিনা ফেজের মধ্যে আবর্তিত হয়। এল নিনো চলাকালীন প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ অতিরিক্ত তাপ একপর্যায়ে বায়ুমণ্ডলে চলে আসে এবং মাসের পর মাস ধরে পুরো গ্রহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখে। যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের এ উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন তাকে সুপার এল নিনো বলা হয়।
বর্তমান পরিমাপ থেকে দেখা যায়, ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা এ শতাব্দীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ক্লাইমেট প্রেডিকশনের প্রধান উইলফরান মোফুমা ওকিয়া বলেন, ‘সব জলবায়ু মডেল এখন একই সুতোয় মিলেছে। এল নিনো শুরু হওয়া এবং আগামী মাসগুলোয় এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিষয়ে আমরা অত্যন্ত নিশ্চিত। মডেলগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঘটনা হতে যাচ্ছে।’
সূত্র: ডেইলি মেইল