সরীসৃপ হলেও টিকটিকি কেন ডাইনোসর নয়

টিকটিকি দেখে ভয় পান অনেকেইফাইল ছবি: এআই/প্রথম আলো

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার প্রজাতির টিকটিকি বসবাস করছে। প্রতিটি প্রজাতির নিজস্ব শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কিছু প্রজাতির দেহে রয়েছে ছাতাসদৃশ ঝালর, কিছুর মাথায় শিং, আবার কিছুর ডানা। বেশির ভাগের চার পা থাকলেও কিছু প্রজাতি দুই পায়ে ভর দিয়ে চলে। আবার কিছু প্রজাতির কোনো পা–ই নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, টিকটিকি কেবল একটি একক বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠীকে নির্দেশ করে না। এরা স্কোয়ামাটা বর্গের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে সাপও রয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ট্যাক্সোনমিক ইনফরমেশন সিস্টেম (আইটিআইএস) অনুযায়ী, এই বর্গের মধ্যে গ্যাকো, ইগুয়ানা, ওয়ার্ম লিজার্ডের মতো বেশ কয়েকটি উপগোষ্ঠী রয়েছে।

সরীসৃপ হলেও টিকটিকি কিন্তু ডাইনোসর নয়। এদের শরীরের গঠন ও চলাচলের পদ্ধতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। টিকটিকির পা পাশের দিকে ছড়ানো থাকে। এরা পাশাপাশি হেলেদুলে চলাফেরা করে। নিউইয়র্কের আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ডাইনোসরের পা শরীরের ঠিক নিচে সোজাভাবে থাকত। টিকটিকি শতকোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে। ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর বিলুপ্ত হলেও এরা বেঁচে যায়। প্রায় ২৬০ মিলিয়ন বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষের দিকে এদের উৎপত্তি ঘটেছিল।

ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষক অ্যালিস্যান্ড্রো পালচি বলেন, টিকটিকির বিবর্তনের হারের নতুন হিসাবের ওপর ভিত্তি করে আমরা এখন প্রায় ২৬ কোটি বছর আগে পার্মিয়ান যুগের শেষের দিকে এই সরীসৃপগুলোর উৎপত্তি নির্ধারণ করতে পারি।

ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো ড্রাগন বিশ্বের বৃহত্তম ও ভারী টিকটিকি প্রজাতি। এদের গড় ওজন ১৫৪ পাউন্ড বা ৭০ কিলোগ্রাম হয়। রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে বড় কোমোডো ড্রাগনটি ১০ দশমিক ৩ ফুট লম্বা ছিল। অন্যদিকে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম টিকটিকি নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। ২০০১ সালের গবেষণায় ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের জারাগুয়া লিজার্ডকে ক্ষুদ্রতম বলা হয়েছিল। লেজ ছাড়া এদের শরীরের গড় দৈর্ঘ্য মাত্র শূন্য দশমিক ৬ ইঞ্চি। তবে ২০২১ সালে মাদাগাস্কারে ব্রুফেসিয়া নানা নামের একটি গিরগিটি আবিষ্কৃত হয়। এর পুরুষ সদস্যরা মাত্র শূন্য দশমিক ৫ ইঞ্চি লম্বা হয়, যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। তবে এর স্ত্রী সদস্যরা জারাগুয়া লিজার্ডের চেয়ে সামান্য বড় হয়।

ছোট আকারের বৈচিত্র্য নিয়ে বাভারিয়ান স্টেট কালেকশন অব জুলজির হার্পেটোলজিস্ট ফ্রাংক গ্লাভ বলেন, সরীসৃপগুলোর সাধারণ শরীরের গঠন স্তন্যপায়ী ও মানুষের কাছাকাছি। তাই এই জীবগুলো এবং তাদের অঙ্গগুলো কত ছোট হতে পারে, তা দেখা সত্যি বিস্ময়কর। কিছু প্রজাতির টিকটিকির বেঁচে থাকার কৌশল বেশ অদ্ভুত। ড্রাকো গণের টিকটিকিরা চামড়ার ডানার সাহায্যে এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে বা ভেসে যেতে পারে। সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ আমেরিকার বাসিলিস্ক লিজার্ড পেছনের পায়ে বেশ দ্রুত দৌড়ায়। তারা পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে। শিকারির হাত থেকে বাঁচতে এরা এই কৌশল ব্যবহার করে। শিকারির মুখোমুখি হলে এরা নিজেদের লেজ খসিয়ে পালিয়ে যায়। পরে নতুন লেজ গজালেও তা মূল হাড়ের পরিবর্তে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি দিয়ে তৈরি হয়।

টিকটিকি পরিবেশের ওপর নির্ভর করে শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখে। তাই এরা শীতল রক্তের প্রাণী। কোমোডো ড্রাগন একবারে নিজের ওজনের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত খাবার খেতে পারে। এরা অন্যান্য সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী খায়। আবার অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল বিয়ার্ডেড ড্রাগন ফলমূল ও পোকামাকড় উভয়ই খায়। অন্যদিকে সামুদ্রিক ইগুয়ানা মূলত সামুদ্রিক শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে।

টিকটিকি বিষধর হলেও সাধারণত মানুষের জন্য মরণঘাতী নয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর-পশ্চিম মেক্সিকোর ‘গিলা মনস্টার’ শিকার ধরতে বা আত্মরক্ষায় বিষ ব্যবহার করে। এদের কামড় তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হলেও প্রাণঘাতী নয়। অনেক প্রজাতি ডিম পাড়ে, আবার কিছু প্রজাতি সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। সবচেয়ে বেশি দিন বাঁচা প্রজাতি হলো গ্র্যান্ড কেইম্যান ব্লু ইগুয়ানা। এরা প্রায় ৫০ বছরের বেশি বাঁচে। একটি ইগুয়ানা বন্দিদশায় ৬৯ বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড গড়েছিল।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২১ শতাংশ সরীসৃপ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষি বিস্তার, বন ধ্বংস ও নগরায়ণের কারণে এদের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। বড় আকারের কোমোডো ড্রাগন থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম ব্রুফেসিয়া নানাসহ সবই আজ অস্তিত্বসংকটে ভুগছে। অবৈধ পশুপাখি ব্যবসার কারণেও বহু বুনো টিকটিকি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স