৬২ হাজার পেঙ্গুইন কেন মারা পড়ল
নানা কারণে পৃথিবীর প্রাণ ঝুঁকির মধ্যে আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আফ্রিকান পেঙ্গুইনরা কেবল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং তাদের সংখ্যায় এক ভয়াবহ ধস নেমেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় জলসীমায় পেঙ্গুইনদের প্রধান খাদ্য সার্ডিন মাছের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ২০০৪ সালের পর থেকে সার্ডিন মাছের পরিমাণ আগের তুলনায় মাত্র এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই সামুদ্রিক পাখিদের ওপর।
কেপ টাউনের নিকটবর্তী ডাসেন আইল্যান্ড এবং রবেন আইল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেঙ্গুইন কলোনিগুলোতে চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার প্রজননক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইন মারা গেছে। এই সংখ্যাটি ওই অঞ্চলের মোট প্রজননক্ষম পেঙ্গুইনের প্রায় ৯৫ শতাংশের সমান।
পেঙ্গুইনদের জীবনে প্রতিবছর একবার পালক বদল বা ক্যাটাস্ট্রফিক মোল্টের সময় আসে। এই সময় তারা প্রায় তিন সপ্তাহের জন্য ডাঙায় চলে আসে ও শরীরের সব পালক ঝরিয়ে ফেলে। এই দীর্ঘ সময় তারা কোনো খাবার খায় না। তাই ডাঙায় আসার আগে তাদের শরীরে প্রচুর চর্বি বা শক্তি সঞ্চয় করতে হয়। পালক বদল শেষে আবারও দ্রুত মাছ খেয়ে শরীরের ক্ষয়পূরণ করতে হয়। গবেষণা বলছে, সার্ডিন মাছের আকাল থাকায় পেঙ্গুইনরা প্রয়োজনীয় চর্বি সঞ্চয় করতে পারছে না। ফলে পালক বদলের এই কঠিন সময়ে বা এর পরপরই অনাহারে মারা যাচ্ছে হাজার হাজার পাখি। ইউনিভার্সিটি অব কেপ টাউনের গবেষকেরা জানান, যখনই সমুদ্রে সার্ডিনের পরিমাণ ২৫ শতাংশের নিচে নেমেছে, তখনই প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইনদের মৃত্যুর হার আকাশচুম্বী হয়েছে।
পরিবেশগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত মাত্রায় সার্ডিন মাছ ধরা হয়েছে। মৎস্য শিকারের এই উচ্চ হার এবং পেঙ্গুইনদের মৃত্যুর হারের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ২০২৪ সালে আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের আনুষ্ঠানিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার পেঙ্গুইন কলোনিগুলোর চারপাশে মাছ ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা নো-টেক জোন তৈরি করেছে। আদালতের নির্দেশনায় ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ছয়টি প্রধান কলোনির আশপাশে বছরজুড়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, কেবল মাছ ধরা বন্ধ করলেই হবে না, পুরো ইকোসিস্টেমে সার্ডিন মাছের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পেঙ্গুইনদের বিচরণক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে এই বিলুপ্তি ঠেকানো কঠিন হবে।
বিজ্ঞানীরা জানান, পেঙ্গুইনদের রক্ষা করতে হলে সার্ডিন মাছ আহরণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। জার্নাল অব আফ্রিকান অর্নিথোলজিতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: আর্থ ডট কম