কৃষ্ণসাগরের তলদেশে লুকানো আছে পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম নদী
পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা আমাজন বা নীল নদের মতো বিশাল সব নদীর কথা জানি। কিন্তু আপনি কি জানেন, মাটির ওপর নয়, বরং সমুদ্রের অতল গহ্বরে লুকিয়ে আছে এমন এক নদী যার জলপ্রবাহের কাছে হার মানবে বিশ্বের বড় বড় অনেক নদী? গবেষকেরা কৃষ্ণসাগরের ১১৫ ফুট বা প্রায় ৩৫ মিটার গভীরে এমনই এক বিশালাকার তলদেশীয় নদীর সন্ধান পেয়েছেন।
১৭ মার্চ প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এই বিস্ময়কর নদীর বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে। এটি কেবল একটি স্রোত নয়, স্থলভাগের নদীগুলোর মতোই এতে রয়েছে জলপ্রপাত, খরস্রোতা ধারা ও প্লাবনভূমি। এই রহস্যময় নদী বসফরাস প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর মূল উৎস হলো ভূমধ্যসাগরের অত্যন্ত লবণাক্ত ও ঘন পানি। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল পারসনস ও তাঁর গবেষক দল উন্নত রোবোটিক ম্যাপিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি নদীটি স্থলভাগে থাকত, তবে পানির প্রবাহের দিক থেকে এটি পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম নদী হতো। এর মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২২ হাজার কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহ লন্ডনের টেমস নদীর চেয়ে ৩৫০ গুণ এবং রাইন নদীর চেয়ে ১০ গুণ বেশি। সমুদ্রের তলদেশের এই নদী কাজ করে ঠিক স্থলভাগের নদীর মতোই। এর রয়েছে সুনির্দিষ্ট পাড় এবং তলদেশীয় জলপ্রপাত। এর প্রবাহের মূল কারণ হলো পানির ঘনত্বের পার্থক্য। ভূমধ্যসাগরের অতি লবণাক্ত পানি যখন তুলনামূলক কম লবণাক্ত কৃষ্ণসাগরে প্রবেশ করে, তখন তা মিশে না গিয়ে ভারী হওয়ার কারণে তলদেশে তলিয়ে যায়। এভাবেই সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং ৩৫ মিটার গভীর একটি চ্যানেল তৈরি হয়েছে, যা মহাদেশীয় তাক বা কন্টিনেন্টাল শেল্ফ বরাবর প্রায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই নদী কেবল একটি ভৌগোলিক বিস্ময়ই নয়, বরং গভীর সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানের জন্য এক অত্যাবশ্যকীয় ধমনি। সমুদ্রের গভীর তলদেশকে অনেক সময় মরুভূমি বলা হয় কারণ সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং পুষ্টির অভাব থাকে। এই নদী উপরিভাগের পুষ্টি ও অক্সিজেন বহন করে গভীরতম অববাহিকায় নিয়ে যায়। এটি কৃষ্ণসাগরের গভীর স্তরে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
গবেষকেরা বিশ্বাস করেন যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর আগে যখন বসফরাস প্রণালি গঠিত হয়েছিল, তখনই এই নদীব্যবস্থা তৈরি হতে শুরু করে। এর পলিস্তর বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস জানা সম্ভব। অটোসাব-৩ নামক ৭ মিটার দীর্ঘ একটি স্বয়ংক্রিয় চালকবিহীন সাবমেরিনের মাধ্যমে এই ম্যাপিং সম্পন্ন করা হয়েছে। বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল পারসনস জানান, গভীর সমুদ্রের এই ধমনি কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা সমুদ্রবিজ্ঞানের জন্য এক বিশাল অগ্রগতি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া