কান্নার পানি কেন লোনা হয়
মানুষের আবেগ বা শারীরিক অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে চোখের পানি বা অশ্রুর মাধ্যমে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে চোখের পানি কেবল পানি নয়, এটি এক জটিল মিশ্রণ, যা আমাদের চোখের সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে।
সহজ কথায়, চোখের পানিতে লবণ থাকে বলেই এটি লোনা। অশ্রুর প্রধান উপাদান পানি হলেও এতে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে। এতে থাকা সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম অশ্রুকে লোনা স্বাদ দেয়। লাইসোজোম ও ল্যাকটোফেরিনের মতো প্রোটিন চোখের সুরক্ষায় কাজ করে। মানুষের অশ্রুতে প্রোটিনের ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে ৬ থেকে ১১ মিলিগ্রাম। এ ছাড়া মিউসিন চোখের মণির ওপর অশ্রুর আস্তরণকে স্থিতিশীল রাখে। অন্যদিকে লিপিড বা চর্বি অশ্রুর পানিকে দ্রুত বাষ্পীভূত হতে বাধা দেয়। চোখ বন্ধ রাখলে পানিরোধী সিল হিসেবে কাজ করে।
প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে প্রায় শূন্য দশমিক ৩ মিলিগ্রাম লবণ থাকে। তবে আপনি কোন ধরনের অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে লবণের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। আসলে মানুষের চোখ তিন ধরনের অশ্রু তৈরি করে, যার প্রতিটির কাজ আলাদা। বেসাল টিয়ার সর্বদা আমাদের চোখে থাকে। চোখের কর্নিয়াকে সিক্ত রাখা, পুষ্টি দেওয়া এবং ধুলাবালি থেকে রক্ষা করাই এর কাজ। সুস্থ দৃষ্টিশক্তির জন্য এই অশ্রু অপরিহার্য। অন্যদিকে রিফ্লেক্স টিয়ার ধোঁয়া, পেঁয়াজের ঝাঁজ বা চোখে কিছু পড়লে এই অশ্রু নির্গত হয়। চোখ থেকে ক্ষতিকারক উদ্দীপক সরিয়ে ফেলাই এর উদ্দেশ্য। এতে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকে। এ ছাড়া আবেগীয় অশ্রু দুঃখ, রাগ, ভয় এমনকি অতিরিক্ত আনন্দের সময় অশ্রু আসে। এই অশ্রুর বিশেষত্ব হলো, এতে স্ট্রেস হরমোন থাকে। কান্নার মাধ্যমে শরীর থেকে এই হরমোন বেরিয়ে যায় বলেই কান্নার পর মানুষ হালকা বোধ করে।
আবেগীয় অশ্রুর তুলনায় বেসাল ও রিফ্লেক্স টিয়ারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। অন্যদিকে আবেগীয় অশ্রুতে লবণের ঘাটতি পুষিয়ে দেয় এতে থাকা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হরমোন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। এই পানি থেকেই তৈরি হয় অশ্রু। চোখের বাইরের দিকের ওপরের কোণে থাকা ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড শরীরের পানি ও লবণ ব্যবহার করে অশ্রু তৈরি করে। এই মিশ্রণটি চোখের ভেতরের কোণে থাকা ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে চোখের মণির ওপর ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া চোখের মেইবোমিয়ান গ্ল্যান্ড প্রয়োজনীয় তেল নিঃসরণ করে চোখের ওপর একটি রক্ষাকারী আস্তরণ তৈরি করে। কাজ শেষে অশ্রু আবার সেই ছিদ্রপথেই শোষিত হয়। অশ্রুনালির মাধ্যমে নাকের পেছনে বা গলার দিকে চলে যায়, যা আমরা অজান্তেই গিলে ফেলি।
ঘাম ও চোখের জল দেখতে এক মনে হলেও এরা আলাদা। ঘাম মূলত শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এতে ভিটামিন-কে ও ক্লোরাইড থাকে। অন্যদিকে অশ্রু শুধু পানি বা লবণের মিশ্রণ নয়; এতে থাকা তেল ও শ্লেষ্মা চোখের পিচ্ছিলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা ঘামে থাকে না।
সূত্র: দ্য কনভার্সেশন