সাগরের মাছে মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

প্লাস্টিক দূষণের কবলে পড়েছে সামুদ্রিক মাছছবি: রয়টার্স

কয়েক দশক ধরেই ভয়ানকভাবে প্লাস্টিক দূষণের মুখে পড়ছে পৃথিবী। মানুষের মস্তিষ্ক, রক্ত, বুকের দুধের পাশাপাশি নাড়ি ও ধমনিতে প্রবেশ করছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রশান্ত মহাসাগরের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জকেও আর মাইক্রোপ্লাস্টিকের কবল থেকে নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রশান্ত মহাসাগরের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা মাছগুলোর প্রতি তিনটির একটিতে প্লাস্টিকের কণার সন্ধান পাওয়া গেছে। এই ভয়াবহ তথ্য প্রমাণ করেছে, প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল দূর সমুদ্র বা শিল্পাঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি সরাসরি মানুষের প্রতিদিনের খাবার টেবিলে প্রবেশ করছে।

গবেষণার জন্য ফিজির ইউনিভার্সিটি অব দ্য সাউথ প্যাসিফিকের গবেষক জাশা ডেম ও তাঁর সহযোগীরা ফিজি, টোঙ্গা, টুভালু ও ভানুয়াতুর মাছ ধরার এলাকা থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা পুরো অঞ্চলে সমান নয়। এর মধ্যে ফিজিতে দূষণের হার সবচেয়ে ভয়াবহ। ফিজির প্রায় ৭৪.৪৬ শতাংশ মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। উপকূলীয় উন্নয়ন, জনাকীর্ণ শহর থেকে নদীতে আবর্জনা ফেলা এবং ঝড়ের কারণে এসব বর্জ্য সরাসরি সাগরের প্রবালপ্রাচীরে গিয়ে মিশছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে থাকা মাছের তুলনায় উপকূলের কাছাকাছি প্রবালপ্রাচীর বা সমুদ্রতলে বিচরণকারী মাছের শরীরে প্লাস্টিক বেশি থাকে। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা শৈবালের সঙ্গে লেগে থাকে অথবা সমুদ্রতলে জমা হয়। মাছ যখন খাবার খোঁজে বা শৈবাল খুঁটে খায়, তখন তারা অজান্তেই এই বিষাক্ত কণাগুলো গিলে ফেলে। এ ছাড়া উপকূলের কাছাকাছি ড্রেন, হারবার ও ডাস্টবিন থাকায় এসব মাছের দূষণের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মাছে পাওয়া প্লাস্টিকের ৬৫ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশই ছিল ক্ষুদ্র তন্তু। এই তন্তু মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা শূন্য দশমিক ২ ইঞ্চির চেয়ে ছোট কণা। এসব সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময় বা পুরোনো মাছ ধরার দড়ি ও জাল থেকে নির্গত হয়।

নতুন গবেষণার বিষয়ে প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের পরিবেশবিজ্ঞানী রুফিনো ভারিয়া বলেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে, কাপড় ও মাছ ধরার সরঞ্জামের তন্তু কেবল সৈকতে জমা হচ্ছে না, বরং এটি সরাসরি মানুষের খাদ্যে ঢুকে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই সতর্ক করেছে, অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহে প্রদাহজনিত সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই কণাগুলো পরিপাকতন্ত্র থেকে মাছের মাংসল অংশে (যা আমরা খাই) পৌঁছায় কি না এবং দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব কতটা মারাত্মক, তা জানার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

সমুদ্রবিজ্ঞানী আমান্ডা ফোর্ড বলেন, প্লাস্টিক চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত এই তথ্যগুলো জাতীয় নীতি নির্ধারণে অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই দ্বীপগুলোকে বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থার উন্নয়ন, পয়নিষ্কাশনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্লাস্টিক আমদানি কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। পিএলওএস ওয়ান জার্নালে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: আর্থ ডটকম