বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘গ্রিন স্টিম’ প্রযুক্তি, বর্জ্য তাপে কমছে কার্বন

চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম ইপিজেডে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিইউনাইটেড পাওয়ারের সৌজন্য

বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধব অর্থাৎ লো কার্বন প্রযুক্তির জয়জয়কার, তখন চট্টগ্রাম ইপিজেডে ঘটে চলেছে এক জ্বালানি–বিপ্লব। চিরাচরিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া বা তাপ বাতাসে ছেড়ে দিয়ে পরিবেশদূষণ করার বদলে সেই ‘বর্জ্য তাপ’ বা ওয়েস্ট হিট কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান ‘গ্রিন স্টিম’ বা পরিবেশবান্ধব বাষ্প। ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এই অভিনব উদ্যোগে একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমছে, তেমনি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প (গার্মেন্টস) কারখানার জ্বালানি বাবদ উৎপাদন খরচ কমেছে প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ। ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আজ বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

বাতাসে না মিশিয়ে সম্পদ তৈরি ইউনাইটেড পাওয়ারের ৭২ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় জেনারেটর থেকে ৪০০–৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ধোঁয়া বের হয়, যা বায়ুমণ্ডলে মিশে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ায়। কিন্তু ইউনাইটেড পাওয়ার এই প্রচণ্ড তাপকে বাতাসে ছেড়ে না দিয়ে ‘এগজস্ট রিকভারি বয়লার’–এর মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে। এই তাপে পানি ফুটিয়ে উচ্চ চাপের বাষ্প তৈরি করা হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি স্টিম প্যাসিফিক জিনস, প্যাসিফিক অ্যাটায়ার্সসহ সাত থেকে আটটি বড় গার্মেন্টস কারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। কারখানার নিজস্ব বয়লারের পরিবর্তে এই স্টিম ব্যবহার করায় তাদের আলাদা করে গ্যাস কিংবা ডিজেল পোড়াতে হচ্ছে না।

পরিবেশ ও অর্থনীতির মেলবন্ধন: কৌশলগত গুরুত্বে এই উদ্যোগ কেবল একটি ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জলবায়ু সুরক্ষা: প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা বলছে, প্রতি টন স্টিম উৎপাদনে প্রায় ১৬০ কেজি কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে। দৈনিক প্রায় চার লাখ লিটার বাষ্প সরবরাহের অর্থ হলো, প্রতিদিন প্রায় ৫৬ হাজার কেজি কার্বন ডাই–অক্সাইড বাতাসে মেশানো থেকে বিরত থাকছে। এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি–১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম) অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

খরচ কমিয়ে বিশ্ববাজারে সক্ষমতা বৃদ্ধি: তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও ভারত। ইউনাইটেড পাওয়ারের দাবি অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিতে কারখানার জ্বালানি খরচ ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে। খরচ কমলে বিশ্ববাজারে আমাদের পোশাকের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত সীমিত। একই গ্যাস পুড়িয়ে একবার বিদ্যুৎ এবং সেই তাপ ব্যবহার করে আবার বাষ্প তৈরি করা—একেই বলে ‘কো–জেনারেশন’ বা সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার। এতে জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হচ্ছে।

প্রথাগত বয়লারের তুলনায় এই গ্রিন স্টিম ব্যবহারে কারখানাগুলোর জ্বালানি খরচ ২০ থেকে ৬০ শতাংশ সরাসরি কমে। যদি কারখানাগুলো নিজেরা এলপিজি ব্যবহার করত, তবে খরচ ৫৫ শতাংশ এবং ডিজেল ব্যবহার করলে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতো। প্রতি টন বাষ্প তৈরিতে প্রতি ঘণ্টায় ১৬০ কেজি কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ রোধ হচ্ছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি লিটার গ্রিন স্টিম সরবরাহ করা হয়েছে, যা মোট ৪৮ হাজার টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ ঠেকিয়েছে।

এ উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে ইউনাইটেড পাওয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে জমা হয়েছে এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড–২০২৫ ও এশিয়ান ইনোভেশন এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড–২০২৫ নামের দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

রাহাত বিন কামাল
ইউনাইটেড পাওয়ারের সৌজন্যে

ইউনাইটেড গ্রুপের হেড অব ইনভেস্টমেন্ট ও মহাব্যবস্থাপক (পাওয়ার ডিভিশন) রাহাত বিন কামাল বলেন, ‘বর্জ্য তাপ থেকে অত্যাধুনিক কোরীয় প্রযুক্তিতে কোনো জ্বালানি ছাড়াই তৈরি এই গ্রিন স্টিম স্বল্প মূল্যে কারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কারখানার উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হচ্ছে।’

ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সহকারী ব্যবস্থাপক রকিব আসিফ হায়দার জানান, কারখানার আটটি জেনারেটরের সাতটিই এখন এই নেটওয়ার্কে যুক্ত। পাইপলাইনের মাধ্যমে এক কিলোমিটার দূরের কারখানায়ও পৌঁছে যাচ্ছে এই বাষ্প।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো (যেমন এইচঅ্যান্ডএম, জারা) এখন ‘নেট জিরো’ বা কার্বনমুক্ত পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী। চট্টগ্রামের এই ‘গ্রিন স্টিম’ মডেল যদি দেশের অন্য শিল্পাঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগকে বিশ্বমঞ্চে পরিবেশবান্ধব ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখবে।

১৯৯৭ সালে ইউনাইটেড গ্রুপ ‘খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’–এর মাধ্যমে দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে। বর্তমানে ইউনাইটেড পাওয়ার দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এ ছাড়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।