অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন মেগাবার্গ সমুদ্রে প্রাণ ছড়াচ্ছে
আইসবার্গ এ-২৩এ ছিল একসময় অ্যান্টার্কটিকার অন্যতম আলোচিত এবং অস্থির একটি বরফখণ্ড। কয়েক দশক আগে এটি মূল বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বছরের পর বছর ওয়েডেল সাগরে আটকে থাকার পর এটি উত্তর দিকে ভাসতে শুরু করে। এমনকি ২০২৫ সালে একটি দ্বীপের সঙ্গে এর সংঘর্ষের উপক্রম হয়েছিল।
২০২৬ সালে এসে এই আইসবার্গটি শেষ এক চমক দেখাচ্ছে বলে জানিয়েছে নাসা। উষ্ণ জলে প্রবেশের পর এটি যখন ভাঙতে এবং গলতে শুরু করে, তখন এর চারপাশে ফাইটোপ্লাঙ্কটনের বিশাল এক সমারোহ বা ব্লুম তৈরি হয়েছে। ফাইটোপ্লাঙ্কটন কেবল সমুদ্রের উপরিভাগের স্তর নয়; এটি সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। আমরা যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, তার অর্ধেকই আসে এই ক্ষুদ্র জীব থেকে। এ ছাড়া বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে সমুদ্রের গভীরে পাঠিয়ে দিতেও এগুলো সাহায্য করে। একে বলা হয় বায়োলজিক্যাল কার্বন পাম্প। একটি বিশাল প্রাচীন বরফখণ্ড গলে যাওয়ার সময় সমুদ্র কীভাবে সাড়া দেয়, ঘটনাটি তারই প্রমাণ।
নাসার বেশ কিছু স্যাটেলাইট এ-২৩এ ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করছিল। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি সুওমি এনপিপি স্যাটেলাইট থেকে বরফখণ্ডের ধ্বংসাবশেষের ছবি তোলা হয়। একই দিনে নাসার পেস স্যাটেলাইট বরফখণ্ডের চারপাশে ক্লোরোফিলের উপস্থিতি শনাক্ত করে।
ক্লোরোফিল-এ মূলত ফাইটোপ্লাঙ্কটন শনাক্ত করার প্রধান রঞ্জক। পৃষ্ঠের কাছাকাছি ক্লোরোফিল বেশি থাকার অর্থ হলো সেখানে ফাইটোপ্লাঙ্কটনের আধিক্য রয়েছে। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী গ্রান্ট বিগ বলেন, এই ব্লুম এতই বিশাল এবং আইসবার্গ থেকে পরিষ্কারভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে এর সঙ্গে বরফখণ্ডের যোগসূত্র অস্বীকার করার উপায় নেই।
দক্ষিণ আটলান্টিক বা দক্ষিণ মহাসাগরের এই অংশে সাধারণত আলো এবং পুষ্টির অভাবে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ঠিকমতো বাড়তে পারে না। কানেটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী হেইডি ডিয়ারসেন জানান, গ্রীষ্মকালেও প্রবল বাতাস ও ঢেউয়ের কারণে ফাইটোপ্লাঙ্কটন সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যায়। সূর্যের আলো না পাওয়ায় তারা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে না। এ ছাড়া এ অঞ্চলে আয়রনের বেশ অভাব রয়েছে। গলিত আইসবার্গগুলো এখানে সারের মতো কাজ করে। বরফ গলে মিষ্টি জল সমুদ্রের লোনাজলের ওপর একটি স্থিতিশীল স্তর তৈরি করে। এটি ফাইটোপ্লাঙ্কটনকে অন্ধকার গভীরে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে সূর্যালোকিত স্তরে টিকিয়ে রাখে। সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে আইসবার্গের ভেতরে থাকা পুষ্টিগুণ।
আইসবার্গের ভেতরে শুধু আয়রন নয়, ম্যাঙ্গানিজ, নাইট্রেট ও ফসফেটের মতো উপাদানও থাকে। অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর যখন ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন পাথর ঘষার ফলে অনেক খনিজ বরফের ভেতরে আটকে পড়ে। বরফখণ্ডটি যখন সাগরে ভাসতে ভাসতে গলে যায়, তখন এই খনিজগুলো পানিতে মিশে যায়। ২৫ জানুয়ারির ছবিতে বরফখণ্ডের ওপর কালচে দাগ দেখা গেছে, যা মূলত ধূলিকণা বা সূক্ষ্ম পলি। এগুলোই সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্রাণের পুষ্টি জোগায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় খণ্ডের চেয়ে ছোট টুকরাগুলো দ্রুত গলে এবং বেশি পুষ্টি ছড়ায়। নাসার পেস সায়েন্স টিমের ইভোনা সেটিনিক জানান, আইসবার্গের চারপাশে পিকোইউক্যারিওটস নামের ক্ষুদ্র জীবগুলো দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছে।
কিছু গবেষণা বলছে, দক্ষিণ মহাসাগরের কার্বন শোষণের প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগ সম্পন্ন হয় এই আইসবার্গগুলোর প্রভাবে। আইসবার্গের রেখে যাওয়া পুষ্টির পথ ফার্টিলাইজার ট্রেইল এক মাসের বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে সেখানে প্রচুর মাছ ও সামুদ্রিক পাখির সমাগম ঘটে।
সূত্র: আর্থ