শনাক্ত হওয়া অতিপারমাণবিক কণা কি হকিং রেডিয়েশন তত্ত্বের প্রথম প্রমাণ

অতিপারমাণবিক কণাইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট

২০২৩ সালে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে থাকা ডিটেক্টরে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অতিপারমাণবিক কণা শনাক্ত হয়েছিল। এত দিন সেই কণার উপস্থিতিকে অসম্ভব বলে অভিহিত করে আসছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে দীর্ঘ গবেষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি দাবি করেছেন, শনাক্ত হওয়া অতিপারমাণবিক কণাটি মহাবিশ্বের শুরুর দিকের কোনো আদিম কৃষ্ণগহ্বর বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। বিজ্ঞানীদের দাবি সত্যি হলে অতিপারমাণবিক কণাটি হবে স্টিফেন হকিংয়ের বিখ্যাত হকিং রেডিয়েশন তত্ত্বের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পরপরই এমন কিছু খুদে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছিল, যেগুলোর ভর কোনো গ্রহ বা বড় গ্রহাণুর সমান হতে পারে। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভূমধ্যসাগরের তলদেশে অবস্থিত কেএম৩নেট টেলিস্কোপে প্রায় ২২০ পেটা-ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির একটি নিউট্রিনো ধরা পড়ে। এই শক্তি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কণা ত্বরক যন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের উৎপাদিত শক্তির চেয়ে প্রায় ১ লাখ গুণ বেশি। মহাবিশ্বের প্রচলিত কোনো উৎস থেকে এত শক্তির কণা আসা প্রায় অসম্ভব।

পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ১৯৭৪ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন কৃষ্ণগহ্বর পুরোপুরি কালো নয়, বরং তা ধীরে ধীরে কণা বিকিরণ করে ভর হারায়। একে হকিং রেডিয়েশন বলা হয়। কৃষ্ণগহ্বর যত ছোট হয়, সেটি তত বেশি উত্তপ্ত হয়। শেষ মুহূর্তে একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায়। গবেষকদের ধারণা, ধরা পড়া ওই নিউট্রিনো ছিল তেমনই এক আদিম কৃষ্ণগহ্বরের অন্তিম মুহূর্তের প্রমাণ।

গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রহস্যের খোঁজ করছেন। যদি এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বে অহরহ বিস্ফোরিত হয়, তবে অ্যান্টার্কটিকার আইসকিউব ডিটেক্টরে কেন তা ধরা পড়ছে না, এমন রহস্যের মুখে পড়েন তাঁরা। এ প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই আদিম কৃষ্ণগহ্বর একধরনের বিশেষ আধান বহন করে, যা সাধারণ বৈদ্যুতিক আধানের চেয়ে অনেক গুণ ভারী। একে ডার্ক চার্জ বলে। এসবের কারণে আইসকিউবের সেন্সরে ধরা না দিলেও উন্নত প্রযুক্তির টেলিস্কোপে সংকেত দিচ্ছে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া থাম বলেন, কৃষ্ণগহ্বর যখন তাদের শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তা অবিশ্বাস্য রকম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণ থেকে মহাবিশ্বের সব ধরনের মৌলিক কণা নির্গত হতে পারে, যার মধ্যে ডার্ক ম্যাটারও থাকা সম্ভব।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার কেবল একটি তত্ত্বের প্রমাণ নয়, বরং মহাবিশ্বের অনেক অজানা জট খুলে দেবে। হকিংয়ের তত্ত্বটি ৫০ বছর ধরে কেবল খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। এটিই হতে পারে তার প্রথম বাস্তব প্রমাণ। বিজ্ঞানী মাইকেল বেকার বলেন, ‘একটি নিউট্রিনো আমাদের মহাবিশ্ব দেখার জানালা খুলে দিয়েছে। আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে আছি, যেখানে হকিং রেডিয়েশন ও ডার্ক ম্যাটারের রহস্য হয়তো খুব শিগগিরই সমাধান হবে।
সূত্র: গ্যাজেট ৩৬০