মৌমাছির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে টিকা তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা
মানুষ, গৃহপালিত পশু এবং গবাদিপশুকে মারাত্মক সব রোগবালাই থেকে বাঁচাতে যুগের পর যুগ ধরে টিকার ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু এবার বিজ্ঞানের পরিধিকে আরও একধাপ বাড়িয়ে এমন কিছু প্রাণীর জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি করা হচ্ছে, যাদের একসময় ইমিউনাইজড বা রোগ প্রতিরোধক্ষম করা অসম্ভব বলে মনে করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের ডালান অ্যানিমেল হেলথের বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে মৌমাছির জন্য টিকা তৈরি করেছেন এবং বর্তমানে গলদা চিংড়ির ওপরও একই ধরনের প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাচ্ছেন।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যেও একধরণের প্রশিক্ষিত প্রতিরোধক্ষমতা থাকে। অতীতে কোনো জীবাণুর সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা তাদের জিনের ভেতরের রোগপ্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করে। এই পরিবর্তনের কিছু অংশ এপিজেনেটিক মেকানিজমের মাধ্যমে ঘটে এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও স্থানান্তরিত হতে পারে। এ বিষয়ে ডালান অ্যানিমেল হেলথের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এরিন স্ট্রেট বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, কীটপতঙ্গকে টিকা দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ডালান অ্যানিমেল হেলথের তৈরি এই টিকা মূলত আমেরিকান ফাউলব্রুড নামক একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে।
অমেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোর শরীরে মানুষের মতো অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক কোনো উন্নত রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নেই, যার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত প্রচলিত টিকা তৈরি করা হয়। ফলে নতুন এই প্রযুক্তি মূলত তাদের সহজাত রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে এবং সেই সুরক্ষাকবচ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এই যুগান্তকারী আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি টাকার খামারশিল্পকে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচাবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ভ্যাকসিন মূলত আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কোনো নির্দিষ্ট রোগজীবাণু বা প্যাথোজেন চিনতে এবং তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে প্রশিক্ষণ দেয়। যেহেতু কীটপতঙ্গ এবং ক্রাস্টেসিয়ানদের মধ্যে চিংড়ি, কাঁকড়া–জাতীয় প্রজাতির প্রাণীদের শরীরে এ ধরনের কোনো সিস্টেম নেই, তাই দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন যে এদের টিকাদান করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
নতুন পদ্ধতিতে প্রতিটি মৌমাছিকে আলাদাভাবে ইনজেকশন দেওয়া হয় না। পরিবর্তে, নিষ্ক্রিয় ব্যাকটেরিয়ার অংশ মৌমাছির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যা শ্রমিক মৌমাছিরা গ্রহণ করে। শ্রমিক মৌমাছিরা এই খাবার প্রক্রিয়াজাত করে রয়্যাল জেলি তৈরি করে এবং তা মৌমাছিদের রানিতে রূপান্তরকারী বা রানি মৌমাছিকে খাওয়ায়। এই জেলি খাওয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়ার কণাগুলো রানির ডিম্বাশয়ে পৌঁছায়। এর ফলে রানি মৌমাছি যে নতুন ডিম বা বাচ্চার জন্ম দেয়, তারা জন্মগতভাবেই এই মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাপ্রাপ্ত রানির লার্ভাগুলো এই রোগ সংক্রমণের হাত থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
বিজ্ঞানী নাইজেল সুইফট জানিয়েছেন, টিকা দেওয়ার পর মৌমাছির কলোনিতে ডিফর্মড উইং ভাইরাসের আক্রমণও অনেক কমে গেছে। মৌমাছির পর এবার ডালান অ্যানিমেল হেলথ গলদা চিংড়ির জন্য ভ্যাকসিন পরীক্ষা শুরু করেছে, যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম একটি লাভজনক মৎস্য চাষ শিল্প। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে প্রতিবছর চিংড়ির খামারিদের কোটি কোটি টাকার লোকসান হয়, বিশেষ করে আর্লি মর্টালিটি সিন্ড্রোম এবং হোয়াইট স্পট সিন্ড্রোম ভাইরাসের কারণে।
মৌমাছির মতোই চিংড়ির এই ভ্যাকসিনও প্রাপ্তবয়স্ক প্রজননক্ষম চিংড়িকে খাবারের মাধ্যমে খাওয়ানো হয়। ফলে তাদের থেকে জন্ম নেওয়া পোনাগুলো শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ভ্যাকসিন কংগ্রেসে এর প্রাথমিক ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এই ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে চূড়ান্ত সফল বলতে নারাজ। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাস্টেসিয়ান সংক্রামক রোগ গবেষক অরুণ ধর বলেন, গবেষণাগারের পরিবেশ এবং বাস্তব মাঠের পরিবেশ সব সময় এক হয় না। তাই এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার আগে মাঠপর্যায়ের আরও তথ্য প্রয়োজন।
ডালান অ্যানিমেল হেলথ খুব শিগগির ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর ফিল্ড ট্রায়াল বা মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই একই নীতি ভবিষ্যতে রেশম পোকা, ঝিনুক, কাঁকড়া এবং লবস্টারের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ ও কৃষিজ প্রাণীর রোগ প্রতিরোধে ব্যবহার করা যাবে। এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন একটি ধারণাকে ভেঙে দিয়ে প্রাণীর চিকিৎসায় এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া