সূর্যের আদি জন্মস্থান খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা
আমাদের সূর্য আজ যেখানে অবস্থান করছে, কয়েক শ কোটি বছর আগে সেটি সেখানে ছিল না। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি বছর আগে সূর্য মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সির ভেতরের দিক থেকে বাইরের দিকে সরে এসেছে। এই যাত্রা সূর্য একা করেনি, বরং একই সময়ে বিশাল এক নক্ষত্রপুঞ্জ একইভাবে স্থান পরিবর্তন করেছে। এই আবিষ্কার সূর্যের বর্তমান অবস্থানকে মহাকাশে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, গ্যালাক্সির এক বিশাল পরিযান বা মাইগ্রেশন বলা যায়।
জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক দাইসুকে তানিগুচি এবং তাঁর দল সূর্যের কাছাকাছি থাকা হাজার হাজার সূর্যের যমজ নক্ষত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন। সোলার টুইন হলো এমন নক্ষত্র, যাদের তাপমাত্রা, মাধ্যাকর্ষণ ও রাসায়নিক গঠন সূর্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া মিশন ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক শ কোটি মহাজাগতিক বস্তুর পর্যবেক্ষণ করেছে। সেই বিশাল তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে গবেষকেরা সূর্যের এক আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা নক্ষত্রদের নিয়ে একটি পরিসংখ্যানগত মডেল তৈরি করেছেন। দেখা গেছে, সূর্যের সমসাময়িক হাজার হাজার নক্ষত্র ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি বছর আগে গ্যালাক্সির ভেতরের অংশ থেকে বর্তমান অবস্থানে চলে এসেছে।
নক্ষত্রদের বয়স নির্ধারণ করা জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন কাজ। বিজ্ঞানীরা প্রতিটি নক্ষত্রের আলো এবং রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে সেগুলোর বয়স বের করেছেন। দেখা গেছে, সূর্যের প্রতিবেশী নক্ষত্রদের মধ্যে একটি বড় অংশের বয়স সূর্যের বয়সের ৪৬০ কোটি বছর কাছাকাছি। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নক্ষত্রদের একটি দীর্ঘ দণ্ডাকৃতির কাঠামো রয়েছে, যা ঘোরার সময় নক্ষত্রদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। আগে ধারণা করা হতো, এই কেন্দ্রের মাধ্যাকর্ষণ বল নক্ষত্রদের বাইরের দিকে আসতে বাধা দেয়। কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে, ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি বছর আগে যখন এই কাঠামো গঠিত হচ্ছিল, তখন এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি স্থির ছিল না। সেই অস্থির সময়েই সম্ভবত সূর্যসহ অনেক নক্ষত্র কেন্দ্র থেকে ছিটকে বাইরের দিকে সরে আসার সুযোগ পেয়েছিল।
গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরে সরে আসা আমাদের পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করেছে। মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি অঞ্চলে নক্ষত্রদের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে বিস্ফোরণ বা ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের বর্তমান অবস্থানটি প্রাণের টিকে থাকার জন্য তুলনামূলক অনেক শান্ত ও নিরাপদ। সূর্যের এই বাইরের দিকের যাত্রা পৃথিবীর মতো গ্রহে প্রাণের বিকাশ এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পথ সহজ করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন সূর্যের যমজ নক্ষত্রদের তালিকাটি আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করছেন। তাঁরা এমন সব নক্ষত্র খুঁজছেন, যেগুলো কেবল সূর্যের বয়সেরই নয়, হুবহু একই রাসায়নিক উপাদান বহন করে। এটি খুঁজে পাওয়া গেলে সূর্যের আদি জন্মস্থান কোথায় ছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে। অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস সাময়িকীতে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম