জিনথেরাপির মাধ্যমে শ্রবণশক্তি ফিরে পেলেন একাধিক বধির ব্যক্তি
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব। সম্প্রতি একটি ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে দেখা গেছে, জিনথেরাপির মাধ্যমে জন্মগতভাবে বধির ব্যক্তিদের শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষক মাওলি দুয়ানের নেতৃত্বে ১ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১০ জন রোগীকে এই থেরাপি দেওয়া হয়। তাঁরা সবাই ওটিওএফ নামক একটি জিনের মিউটেশনের কারণে জন্মগত বধিরতায় ভুগছিলেন।
নেচার মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তঃকর্ণে মাত্র একটি ইনজেকশন দেওয়ার পরই অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের শ্রবণশক্তিতে পরিমাপযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। কারও কারও ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি এতই দ্রুত ছিল যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁরা কথা বুঝতে শুরু করেন। এই সাফল্য জন্মগত শ্রবণহীনতার লক্ষণগুলো ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এর মূল কারণ নিরাময়ে একটি বিশাল পদক্ষেপ। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল ওটিওএফ জিনের মিউটেশন সারিয়ে তোলা। এই জিন ওটোফারলিন নামক একটি প্রোটিন তৈরির জন্য দায়ী। এটি অন্তঃকর্ণ থেকে মস্তিষ্কে শব্দসংকেত পাঠানোর জন্য অপরিহার্য। এই প্রোটিনের অভাবে শব্দসংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে না, ফলে জন্ম থেকেই গভীর বধিরতা দেখা দেয়। তবে এই রোগীদের অন্তঃকর্ণের শারীরিক গঠন সাধারণত অক্ষত থাকে, যা তাঁদের জিনথেরাপির জন্য আদর্শ লক্ষ্য করে তোলে।
গবেষকেরা একটি কৃত্রিম ভাইরাসকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে ওটিওএফ জিনের একটি কার্যকর কপি সরাসরি অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দেন। এই থেরাপি কানের ককলিয়ার রাউন্ড উইন্ডো মেমব্রেনের মাধ্যমে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। ককলিয়া মূলত শব্দের কম্পনকে স্নায়বিক সংকেতে রূপান্তর করে। জিনের এই নতুন কপি কোষে প্রবেশ করার পর ওটোফারলিন প্রোটিন উৎপাদন শুরু করে, ফলে জন্ম থেকে অকেজো থাকা শ্রবণপথটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টের মতো বাহ্যিক যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে, এই পদ্ধতিতে কোষীয় স্তরে প্রাকৃতিক শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। গবেষণার ফল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। রোগীদের শ্রবণশক্তি ১০৬ ডেসিবেল থেকে ৫২ ডেসিবেলে নেমে এসেছে, যা সাধারণ কথোপকথন শোনার জন্য যথেষ্ট।
গবেষকদের তথ্যমতে, অধিকাংশ রোগীই চিকিৎসার এক মাসের মধ্যে শ্রবণশক্তি ফিরে পেতে শুরু করেন এবং ছয় মাসের মধ্যে সবার ক্ষেত্রেই উন্নতি লক্ষ করা গেছে। গবেষণায় ৫ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নমনীয়তা বেশি থাকায় ফলাফল দ্রুত পাওয়া গেছে। তবে কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই থেরাপি উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছে, যা এই চিকিৎসার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষক মাওলি দুয়ান বলেন, এটি বধিরতার জিনগত চিকিৎসায় একটি বিশাল পদক্ষেপ, যা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জীবন বদলে দিতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই থেরাপি নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সাময়িকভাবে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কিছুটা কমলেও পরে কোনো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি লক্ষ করা যায়নি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া