হাঙরের আচরণ বদলে যাচ্ছে কেন
সূর্য ডোবার পর সমুদ্র অন্ধকার হয়ে যাওয়াই প্রকৃতির নিয়ম। কোটি কোটি বছর ধরে এই আলো-আঁধারির চক্র মেনেই সামুদ্রিক প্রাণীরা খাবার খোঁজে বা বিশ্রাম নেয়। তবে বর্তমানে উপকূলীয় শহরগুলোর কৃত্রিম আলো সমুদ্রের সেই চিরচেনা অন্ধকার কেড়ে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিয়ামির শার্ক রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন প্রোগ্রামের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের কৃত্রিম আলো হাঙরের মতো প্রাচীন শিকারি প্রাণীদের জৈবিক স্তরে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বন্য হাঙরের রক্তে মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা পরিমাপ করেছেন। মেলাটোনিন মূলত প্রাণীর শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা দিন-রাত্রির চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত রাতে এই হরমোনের মাত্রা বাড়ে ও দিনে কমে। মানুষের ক্ষেত্রে এই চক্র ব্যাহত হলে ঘুমের সমস্যা বা বিপাকীয় রোগ দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা মিয়ামি উপকূলের উজ্জ্বল আলোর কাছাকাছি থাকা হাঙরের সঙ্গে অন্ধকার অঞ্চলের হাঙরের তুলনা করেছেন। এ জন্য দুই ধরনের হাঙর নার্স শার্ক ও ব্ল্যাকটিপ শার্ক বেছে নেওয়া হয়। নার্স শার্ক সাধারণত একটি নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘ সময় থাকে। অন্যদিকে ব্ল্যাকটিপ শার্ক উপকূলের বিশাল এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল আলোর নিচে থাকা নার্স শার্কের রক্তে মেলাটোনিনের মাত্রা অন্ধকার অঞ্চলের নার্স শার্কের তুলনায় অনেক কম। তবে ব্ল্যাকটিপ শার্কের ক্ষেত্রে এমন কোনো বড় পার্থক্য দেখা যায়নি। বিজ্ঞানী অ্যাবিগেল টিনারি জানান, কৃত্রিম আলো হাঙরের মেলাটোনিন কমিয়ে দিলেও তা নির্ভর করে প্রাণীর আচরণের ওপর। যারা সারা রাত নির্দিষ্ট একটি উজ্জ্বল আলোযুক্ত এলাকায় কাটায়, তাদের শরীরে প্রভাব বেশি পড়ছে। গবেষণার সহ-লেখক ড্যানিয়েল ম্যাকডোনাল্ড বলেন, হাঙর প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এসেছে। মানুষের মতো তাদের শরীরও আলোর প্রতি একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এটি একটি মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়া যা বিবর্তনের ধারায় সংরক্ষিত রয়েছে। এই আবিষ্কার মানুষের ঘুমের সমস্যা বা হরমোনজনিত রোগের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজে পেতেও সাহায্য করতে পারে।
সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করায় হাঙরের এই পরিবর্তন পুরো সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানী নীল হ্যামারশ্লাগ। তিনি জানান, আবাসস্থল ধ্বংস বা রাসায়নিক দূষণের মতোই আলোর দূষণকেও এখন বড় পরিবেশগত হুমকি হিসেবে দেখা উচিত। উপকূলে উন্নয়ন যত বাড়ছে, সমুদ্রের অন্ধকার ততই হারিয়ে যাচ্ছে। আর এর সূক্ষ্ম প্রভাব হাঙরের শরীরের ওপর স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
সূত্র: আর্থ ডটকম