নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে থাকা খুদে গ্রহাণুতে রহস্যময় বায়ুমণ্ডলের সন্ধান
নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে থাকা মাত্র ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণুতে অজানা এক খুদে জগতের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা আকাশ বা বায়ুমণ্ডল নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০০২ এক্সভি৯৩ নামের গ্রহাণুটির অভিকর্ষ বল এতটাই দুর্বল যে কোনো বায়ুমণ্ডলকে বেশিক্ষণ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। তবে আশ্চর্যজনকভাবে গ্রহাণুটিতে বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অত্যন্ত পাতলা ও সূক্ষ্ম হলেও গ্রহাণুটিতে বায়ুমণ্ডল থাকারই কথা ছিল না।
শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও সৌরজগতের অন্ধকার এবং শীতল প্রান্তরে অবস্থিত বরফ ও পাথরযুক্ত ক্ষুদ্র গ্রহাণুটির বায়ুমণ্ডল আমাদের জ্ঞান চিরতরে বদলে দিতে পারে। ২০০২ এক্সভি৯৩ মূলত একটি প্লুটিনো–জাতীয় গ্রহাণু। এটি বামন গ্রহ প্লুটোর মতো একটি নির্দিষ্ট ছন্দে কক্ষপথ ভাগ করে নেয়, যা সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের প্রায় ৪০ গুণ দূরে অবস্থিত এবং নেপচুনের কক্ষপথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ছোট বরফের জগৎ আদি সৌরজগতের একটি জীবাশ্মের মতো। এগুলো থেকে জানা সম্ভব সৌরজগৎ কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল এবং এর বিবর্তন কীভাবে ঘটেছে। তবে নেপচুনের বাইরের এই এলাকা কুইপার বেল্ট নামে পরিচিত। সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকায় এলাকাটিতে থাকা বিভিন্ন বস্তু খুব কম আলো প্রতিফলন করে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
২০২৪ সালে জাপানের ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরির কো আরিমাতসুর নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এক বিরল সুযোগ কাজে লাগান। তাঁরা দেখেন, এই প্লুটিনোটি একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছে, যাকে বলা হয় নাক্ষত্রিক গ্রহণ। জাপানের তিনটি ভিন্ন স্থান থেকে গবেষকেরা এই দৃশ্য ধারণ করেন।
সাধারণত কোনো বায়ুমণ্ডলহীন পাথুরে বস্তু যখন কোনো তারার আলো ঢেকে দেয়, তখন সেই আলো হঠাৎ নিভে যায় এবং গ্রহণ শেষে হঠাৎ জ্বলে ওঠে। কিন্তু ২০০২ এক্সভি৯৩-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, পূর্ণ গ্রাসের প্রায় ১.৫ সেকেন্ড আগে এবং পরে নক্ষত্রের আলো সরাসরি নিভে না গিয়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়েছে ও ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে। আলোর এই ক্রমিক হ্রাস ও বৃদ্ধি তখনই সম্ভব, যদি নক্ষত্রের আলো কোনো বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিসরিত হয়।
বিজ্ঞানীদের মডেল অনুযায়ী, এই বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বের তুলনায় প্রায় ৫০ থেকে ১০০ লাখ গুণ পাতলা। বায়ুমণ্ডলটি মিথেন, নাইট্রোজেন বা কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে গঠিত হতে পারে। এই আবিষ্কার দুটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা জানান, ‘আমাদের যন্ত্রপাতি এখন এতটাই সংবেদনশীল যে সৌরজগতের প্রান্তরে থাকা প্রায় অস্তিত্বহীন বায়ুমণ্ডলও শনাক্ত করা যাচ্ছে।’ মডেল অনুযায়ী, এই ক্ষুদ্র গ্রহের বায়ুমণ্ডল কয়েক শ থেকে এক হাজার বছরের মধ্যেই মহাকাশে হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু এখনো সেখানে বায়ুমণ্ডল আছে, এর মানে হলো এটি কোনোভাবে আবার পূর্ণ হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা এর দুটি সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। হতে পারে কোনো বিশাল ধূমকেতু এই গ্রহাণুটির ওপর আছড়ে পড়েছিল, যার ফলে নির্গত গ্যাস একটি অস্থায়ী বায়ুমণ্ডল তৈরি করেছে, যা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। অথবা প্লুটোর মতো এই ছোট জগতেও সক্রিয় বরফ-আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যা অনবরত ভেতর থেকে গ্যাস ও উদ্বায়ী পদার্থ নির্গত করে বায়ুমণ্ডলকে সজীব রাখছে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট