চট্টগ্রামে ফ্রিল্যান্সার কার্ড রেজিস্ট্রেশনের যাত্রা শুরু হলো। একজন ফ্রিল্যান্সারের জীবনে এই ‘কার্ড’ আসলে কতটা পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে?
ফায়সাল আলিম: ধন্যবাদ! অনুভূতিটা আসলে দারুণ। একটা সময় ছিল যখন সমাজ, ব্যাংক, এমনকি পরিবারের কাছেও ফ্রিল্যান্সিং মানে ছিল ‘ছেলেটা বা মেয়েটা রাতে জেগে কী যেন করে!’ অর্থাৎ, তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ছিল না। এই ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড আমাদের তরুণদের বিনিদ্র রজনীর অফিশিয়াল বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এই কার্ড একজন ফ্রিল্যান্সারের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয়সংকট দূর করবে। এখন তারা বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, ‘আমি দেশের একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং এটা আমার রাষ্ট্রীয় পরিচয়।’
আপনি পরিচয়ের কথা বললেন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে—যেমন ব্যাংকঋণ, ক্রেডিট কার্ড বা পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কার্ড কতটা সাহায্য করবে?
ফায়সাল আলিম: আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করছি। আগে ফ্রিল্যান্সাররা ব্যাংকে গেলে আয়ের উৎস বা পেশার প্রমাণ দিতে পারত না বলে ক্রেডিট কার্ড বা ঋণ পাওয়া দুরূহ ছিল। এখন এই আইডি কার্ডের মাধ্যমে তারা ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আমাদের ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটির যে দূরত্ব ছিল, এই কার্ড সেটা কমিয়ে আনবে। এ ছাড়া পাসপোর্ট বা ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রেও ‘পেশা’ হিসেবে ফ্রিল্যান্সিংকে প্রমাণ করার একটা অকাট্য নথি হিসেবে কাজ করবে এটি। আজকে চট্টগ্রাম বিভাগে উদ্বোধনের মাধ্যমে আমরা ঢাকার বাইরের বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার পথ তৈরি করলাম। চট্টগ্রাম কিন্তু এখন আর শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, এটা ডিজিটাল প্রতিভারও একটা বড় হাব।
আজকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনও তরুণদের এই অগ্রযাত্রার প্রশংসা করলেন। সরকারের এই ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফায়সাল আলিম: দেখুন, সরকার যখন ভূমি মন্ত্রণালয় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একেবারে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মাধ্যমেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়, তখন বুঝতে হবে প্রযুক্তির হাওয়া প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই তরুণদের এই ইনোভেশন আর এন্টারপ্রেনিউরশিপকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দারুণ ইতিবাচক। সুন্দর প্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে যে ফ্রিল্যান্সারদের বাদ দিয়ে ভাবা যাবে না, সরকারের এই উপস্থিতি এবং সমর্থন সেটাই প্রমাণ করে। আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
নতুন যাঁরা এই খাতে আসতে চান বা কেবল কাজ শুরু করেছেন, তাঁদের জন্য এই কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ? এর জন্য কী করতে হবে?
ফায়সাল আলিম: আমরা প্রক্রিয়াটি একদম পানির মতো সহজ রাখার চেষ্টা করেছি, যাতে কোনো ফ্রিল্যান্সারকে কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। নির্দিষ্ট সরকারি পোর্টালের নির্দেশিকা অনুসরণ করে অনলাইনেই আবেদন করা যাবে। নির্দিষ্ট কিছু আয়ের প্রমাণ বা কাজের পোর্টফোলিও জমা দিলেই ভেরিফিকেশন শেষে কার্ডটি দেওয়া হবে। আমি নতুনদের বলব, কার্ডের পেছনে ছোটার আগে কাজ শিখুন, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করুন। আপনার দক্ষতা আর সততা থাকলে এই কার্ড আপনার অধিকার হিসেবে আপনার কাছে এমনিতেই পৌঁছাবে।
এই কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চিত্র আপনি কেমন দেখছেন?
ফায়সাল আলিম: বৈশ্বিক বাজারে ডিজিটাল সার্ভিসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এআই বা নতুন প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের তরুণেরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা আর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়, তবে তারা বিশ্ব জয় করবে। ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড আসলে সেই সম্ভাবনার দরজার একটা চাবি। এটি যত বেশি ফ্রিল্যান্সারের হাতে পৌঁছাবে, আমাদের অর্থনীতিতে বৈধ পথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ তত বাড়বে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হবে এবং তরুণেরা ফ্রিল্যান্সিংকে একটা ফুলটাইম ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নিতে আরও বেশি উৎসাহিত হবে। আমার স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে অন্তত একজন করে দক্ষ ডিজিটাল পেশাজীবী তৈরি হবে।
বিপিও সামিটে আপনি আরও একটা বড় ঘোষণা দিয়েছেন—আপনি একটি ‘ফ্রিল্যান্সার সামিট’ করতে যাচ্ছেন। এটি আসলে কীভাবে এবং কবে নাগাদ করার পরিকল্পনা করছেন? আর এখানে কি বাংলাদেশের সব ফ্রিল্যান্সারের অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকবে?
ফায়সাল আলিম: আমরা খুব শিগগির দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে ফ্রিল্যান্সার সামিট আয়োজন করতে যাচ্ছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের তরুণসমাজকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে তাদের উপার্জনের সক্ষমতাকে আরও জোরালো ও সক্রিয় করে তোলা। পরিকল্পনার কথা যদি বলি, আমরা চাচ্ছি ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সারদের কাছে পৌঁছাতে। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে রাজশাহী বিভাগ থেকে এই সামিটের আয়োজন শুরু করার। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগেও এটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আর অংশগ্রহণের সুযোগের ব্যাপারে বলতে চাই—হ্যাঁ, অবশ্যই! বাংলাদেশের সফল ফ্রিল্যান্সারদের পাশাপাশি যারা এই সেক্টরে একদম নতুন বা ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী, তাদের সবার জন্যই এখানে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। এটি কেবল একটি সম্মেলন হবে না, বরং অভিজ্ঞ ও নতুনদের মাঝে নেটওয়ার্কিং, নলেজ শেয়ারিং এবং নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের একটা দারুণ প্ল্যাটফর্ম হবে। আমরা খুব দ্রুতই এর বিস্তারিত সময়সূচি ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সবার মাঝে প্রকাশ করব।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ফায়সাল আলিম: আপনাকেও ধন্যবাদ।