টিউশনির টাকায় শুরু হওয়া আসাদুজ্জামানের ‘আমার খামার’ এখন যেন সবার
শহরের যান্ত্রিকতা, যানজট ও ইটপাথরের দেয়ালের মধ্যে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, তখন আমরা স্বপ্ন দেখি একটুকরা সবুজের। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে কজনই–বা সাহস করে মাটির টানে ফিরে যেতে পারেন? আসাদুজ্জামান পেরেছেন। শরীয়তপুরের গোসাইরহাটের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে তিনি। মা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিনা আক্তার, বাবা প্রয়াত দেওয়ান আলাউদ্দিন। কিন্তু আসাদুজ্জামানের পরিচয় আজ শুধুই এক জননীর সন্তান হিসেবে নয়; বরং একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা ও উদ্যোক্তা হিসেবে।
শূন্য থেকে শুরু
গল্পটি শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়ার সময় থেকেই আসাদুজ্জামানের মাথায় ঘুরত—নিজে কিছু করতে হবে। পকেটে টাকা নেই, কিন্তু বুকে ছিল পাহাড়সম জেদ। সেই জেদ থেকেই শুরু হলো হাড়ভাঙা খাটুনি। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে টিউশনি ও ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানে চাকরি। অর্থ জমিয়ে দুই লাখ টাকা যখন হাতে এল, তখনই তিনি নামলেন জীবনের আসল পরীক্ষায়।
অনেকে যখন এসি রুমে বসে ভবিষ্যতের ছক কষেন, আসাদুজ্জামান তখন রোদ–বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘুরতেন কারওয়ান বাজারে। কোন পণ্য কোথা থেকে আসছে, পাইকারি দর কত—এসব তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিতেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে।
মাঠ থেকে ঘাটাইলের পথে
২০১৮ সালে নিজের গ্রামে মাত্র এক হাজার ব্রয়লার মুরগি আর ছোট একটি পুকুরে মাছ চাষ দিয়ে আসাদুজ্জামানের যাত্রা শুরু। কিন্তু আসাদুজ্জামানের লক্ষ্য ছিল আরও বড়। তিনি চাইলেন এমন জায়গায় খামার করতে, যেখান থেকে ঢাকা খুব কাছে। বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে বেছে নিলেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল।
২০২২ সালে ১৩ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হলো ‘আমার খামার’। বন্ধু সাব্বির হাসানকে সঙ্গে নিয়ে ১ হাজার ২০০ লেয়ার মুরগি দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সেখানে ২৫ হাজার মুরগি। প্রতিদিন ২৫ হাজার ডিম তাঁর নিজস্ব পরিবহনে পৌঁছে যায় ঢাকার বড় বড় আড়ত ও দোকানে।
কেবল খামার নয়, একটুকরা গ্রাম
আসাদুজ্জামান কেবল মুরগির ডিমেই আটকে থাকেননি। তাঁর কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়েছে মাঠের পর মাঠ। টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন শোভা পাচ্ছে ১ হাজার ৮০০ পেঁপেগাছ আর সাড়ে চার হাজার সাগর কলার বাগান। চুয়াডাঙ্গা থেকে যশোর—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তাঁর মৌসুমি ফসলের প্রকল্প। বর্তমানে ৩২ কর্মী দিনরাত খাটছেন এই স্বপ্নকে সচল রাখতে।
কৃষকের বন্ধু ‘আমার খামার’
আসাদুজ্জামান বিশ্বাস করেন, একা বড় হওয়ার নাম সাফল্য নয়। তাই তিনি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্মার্ট ফার্মিং চালু করেছেন। ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকেরা এখন ফসলের রোগবালাই বা বাজারদর সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সমাধান পাচ্ছেন। শুধু তা–ই নয়, ২০২৭ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ কৃষককে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। সম্প্রতি চালু করেছেন কৃষকের সন্তানের জন্য শিক্ষাবৃত্তিও।
আগামী দিনের স্বপ্ন: অ্যাগ্রি রিসোর্ট
ঘাটাইলের সেই সবুজ খামারে দাঁড়িয়ে আসাদুজ্জামান শোনালেন তাঁর বড় স্বপ্নের কথা। ২০২৬ সাল নাগাদ তিনি চালু করতে যাচ্ছেন ‘আমার খামার গ্রামীণ অ্যাগ্রি রিসোর্ট’। এটি কেবল বিলাসী কোনো অবকাশকেন্দ্র হবে না, এটি হবে এমন এক জায়গা, যেখানে শহরের মানুষ এসে নিজ হাতে কৃষিকাজ দেখবে, মাটির ঘ্রাণ নেবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে তুলবে এক আত্মিক সম্পর্ক।
আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখলেই আমাদের ভবিষ্যৎ টেকসই হবে। কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে আমার খামার বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ কৃষককে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সম্প্রতি কৃষকদের ছেলেমেয়ের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছি আমরা।’