দুই সপ্তাহের ডিজিটাল ডিটক্স বাড়াতে পারে মনোযোগ, কমাতে পারে বিষণ্নতা

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ফাইল ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে করা এক মামলার শুনানিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ২০ বছর বয়সী এক তরুণী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে তা তুলে ধরে তিনি জানান, শৈশব থেকেই অনলাইনে সময় কাটানোর অভ্যাস ছিল তাঁর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অভ্যাস এমন মাত্রা পায় যে দিনের যেকোনো সময় অবসর পেলেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেন। ফলে ধীরে ধীরে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা, ধীরে ধীরে ঘুমের সময় কমে যাওয়া সব মিলিয়ে একধরনের নিয়ন্ত্রণহীন চক্রে আটকে পড়েন তিনি। বারবার চেষ্টা করেও এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা।

মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে করা আলোচিত এই মামলায় জুরি বোর্ড প্রতিষ্ঠান দুটিকে অবহেলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ওই তরুণীকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোতে সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া এ ধরনের রায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সমালোচকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে সেগুলোতে আটকে থাকেন এবং একধরনের আসক্তি তৈরি হয়। তামাক বা জুয়ার মতোই মানুষকে আসক্ত করার উদ্দেশ্যে এসব পণ্য তৈরি করা হয়। গবেষণার ফলাফলও ক্রমে এই আশঙ্কাকে জোরদার করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে না, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মনঃসংযোগের মতো জ্ঞানীয় সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু গবেষণায় এটিকে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

তবে গবেষকেরা বলছেন, এই ক্ষতি থেকে ফিরে আসার কার্যকর উপায়ও রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়া হলে বা ডিজিটাল ডিটক্সের মাধ্যমে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। জরিপে দেখা গেছে, গড়পড়তা একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করেন। কেউ যদি দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টাও ফোন ব্যবহার করেন, তবু বছরে প্রায় দেড় মাস সময় কেবল ফোনেই ব্যয় হয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কস্তাদিন কুশলেভ বলেন, ‘আমাদের প্রায় সবারই ফোনের সঙ্গে সম্পর্কটা কিছুটা অস্বাস্থ্যকর।’

ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার বিষয়টি শুনতে সাময়িক ট্রেন্ড বলে মনে হলেও সম্প্রতি পিএনএএস নেক্সাস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা ফলাফলে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণায় ৪৬৭ জন অংশ নেন, যাঁদের গড় বয়স ৩২ বছর। অংশগ্রহণকারীদের ১৪ দিনের জন্য একটি অ্যাপ ব্যবহার করে স্মার্টফোনে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখতে বলা হয়। তবে ফোনকল ও খুদে বার্তা চালু ছিল, ফলে তাঁদের ফোন কার্যত সাধারণ ফোনে পরিণত হয়। এই সময় অংশগ্রহণকারীদের দৈনিক অনলাইন ব্যবহার ৩১৪ মিনিট থেকে কমে ১৬১ মিনিটে নেমে আসে। দুই সপ্তাহ শেষে দেখা যায়, তাঁদের মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা ও সামগ্রিক কল্যাণবোধ সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, মনোযোগের এই উন্নতি প্রায় ১০ বছরের বয়সজনিত অবনতির সমতুল্য। বিষণ্নতার উপসর্গ কমানোর ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির প্রভাব উল্লেখযোগ্য। কিছু ক্ষেত্রে তা প্রচলিত ওষুধের চেয়েও বেশি এবং মানসিক চিকিৎসার কিছু পদ্ধতির কাছাকাছি।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যাঁরা পুরো সময় নিয়ম মেনে চলতে পারেননি, তাঁরাও আংশিক সুফল পেয়েছেন। এমনকি পরীক্ষার পরবর্তী সময়েও অনেকের ক্ষেত্রে এই ইতিবাচক প্রভাব বজায় ছিল। গবেষকেরা বলছেন, কম্পিউটারের তুলনায় স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাব বেশি নেতিবাচক। কারণ, ফোন ব্যবহারের ধরন অনেক সময়ই অভ্যাসগত ও অচেতন। হাঁটা, কথা বলা বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার মাঝেও মানুষ ফোন ব্যবহার করেন, যা মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায় ও চলমান অভিজ্ঞতার মান কমিয়ে দেয়। এতে সামাজিক যোগাযোগের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষকদের মতে, সামান্য মনোযোগ বিচ্যুতিও সম্পর্কের গভীরতা ও কথোপকথনের সন্তুষ্টি কমিয়ে দিতে পারে।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোয়া কাস্তেলো বলেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই এই গবেষণার ধারণা আসে। আমি লক্ষ করেছিলাম, স্মার্টফোন কীভাবে মানুষের সময় ও মনোযোগকে প্রভাবিত করছে। এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

গত নভেম্বরে ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’–এ প্রকাশিত হার্ভার্ডের প্রায় ৪০০ মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহ স্মার্টফোন ব্যবহার কমালে উদ্বেগ ১৬ শতাংশ, বিষণ্নতা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং অনিদ্রা ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক জন টোরাস বলছেন, বিষয়টি সবার জন্য এক নয়। কারও ক্ষেত্রে ব্যবহার খুব বেশি, কারও ক্ষেত্রে খুব কম। আবার কারও জন্য তা একেবারেই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তা চিহ্নিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।’

এদিকে ২৩টি দেশের ৮ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়ে আরও বড় একটি গবেষণা চলছে। ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের আংশিক অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের নবাগত সহকারী অধ্যাপক স্টিভেন রাথজে। এতে অংশগ্রহণকারীদের টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও ফেসবুক ব্যবহারের সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটে সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফল থেকে স্মার্টফোন ব্যবহারের বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গবেষকেরা ধারণা করছেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে স্মার্টফোন ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট