দেশে তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেনি—আহমেদ হাসান

দেশের শীর্ষ খুচরা পণ্য বিক্রেতা রায়ান্স কম্পিউটার্স এই জানুয়ারিতে ২৬ বছর পূর্ণ করেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের শাখা আছে। রায়ান্স কম্পিউটার্সের পাশাপাশি রায়ান্স আর্কাইভস ও রায়ান্স কেয়ার নামে দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। রায়ান্সের একটি ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা এবং দেশের কম্পিউটার বাজারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পল্লব মোহাইমেন

প্রথম আলো:

রায়ান্স কম্পিউটার্সের ২৬ বছর পূর্ণ হলো সম্প্রতি। যখন শুরু করেছিলেন, তখন আর এখনকার কম্পিউটার বাজারের মূল পার্থক্যটা কী?

আহমেদ হাসান: খুব বড় পার্থক্য এমন কিছু নয়। বাজারের আকার, মানুষের সচতেনতা—এগুলোতে পার্থক্য স্বাভাবিক। ব্যবসার ধরনটা একরকমই আছে। তবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আগে প্রথম আলোর মতো মূলধারার পত্রিকা ব্যবহার করতাম, এখন সে জায়গাটা নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

প্রথম আলো:

রায়ান্স কম্পিউটার্সের এখন কয়টা শাখা? সব শাখা মিলিয়ে কতজন কর্মী কাজ করেন?

আহমেদ হাসান: ২২টি শাখা। সর্বশেষ কুষ্টিয়ায় (২০২৫)। মোট ৭০০ জনের মতো কর্মী কাজ করেন।

প্রথম আলো:

কম্পিউটার পণ্যের খুচরা বিক্রিতে রায়ান্স একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে, এটা কীভাবে তৈরি হলো। খুচরা বিক্রির দিক থেকে আপনারাই তো ১ নম্বরে?

আহমেদ হাসান: খুচরা বিক্রিতে আমরা মনে করি, ১ নম্বর অবস্থানে আছি। ডেটাও তা–ই বলে। আমাদের প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল খুচরা বিক্রি করব, অন্য কিছু করব না। ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার ব্যাপারে যা যা লাগে, প্রথম দিন থেকে সেদিকে নজর দিয়েছি। এখনো দিচ্ছি। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়ের দিকে যারা কম্পিউটার ব্যবসায় ছিল, তাদের হারিয়ে যাওয়া দেখে আমি বিস্মিত হই। কারণ, তারা ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে চায়নি। আমাদের তুলনায় তারা শক্তিশালী ছিল। ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার জন্য দরকার ক্রেতার প্রতি কমিটমেন্ট আর সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা। লাভের দিকে শুধু নজর দিলে হয় না, নির্লোভ হলে সেটি জমা হয় ব্র্যান্ডভ্যালুতে। এ জন্য ধৈর্য থাকতে হয়। সে  ধৈর্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কম।  

আহমেদ হাসান
ছবি: রায়ান্স কম্পিউটার্সের সৌজন্যে
প্রথম আলো:

রায়ান্সের আর কোনো প্রতিষ্ঠান আছে কি?

আহমেদ হাসান: ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করি রায়ান্স আর্কাইভস। তখন খুব ছোট পরিসরে এটা শুরু করি। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করি রায়ান্স কেয়ার। এটা সার্ভিস সেন্টার।

প্রথম আলো:

রায়ান্স আর্কাইভস প্রতিষ্ঠার মূল কারণ কী? আর্কাইভস যে একটি ব্যবসা হয়ে উঠতে পারে, এটা বুঝলেন কীভাবে? কবে থেকে আর্কাইভস চালু আছে? কারা আপনার ক্লায়েন্ট?

আহমেদ হাসান: আর্কাইভ মানে তো তথ্য। প্রকাশিত তথ্য। আমরা চেষ্টা করেছি, সব তথ্য একসঙ্গে করে মানুষকে দিতে। একটি হলো ব্যবসায়িক তথ্য, আরেকটি হলো সামাজিক–রাজনৈতিক তথ্য। বাংলাদেশে যারা ভালো ব্যবসা করে, তারা সবাই আমাদের ক্লায়েন্ট। তারপর দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আছে। রায়ান্স আর্কাইভস লাভজনক হতে ১০ বছরের বেশি সময় লেগেছে। এখন ১০০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন। প্রথম ১০ বছরে ৪–৫ জন ক্লায়েন্ট ছিল। এখন তো বাংলাদেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান আর্কাইভ ছাড়া অচল। টিভি, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সব তথ্যই আমাদের কাছে আছে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমরা তথ্য সরবরাহ করি। আমরা এখন শ্রীলংকা ও নেপালের মিডিয়া মনিটরও করছি।  

প্রথম আলো:

রায়ান্স কেয়ারের এখন কয়টি শাখা?

আহমেদ হাসান: রায়ান্স কেয়ার মূলত সার্ভিস সেন্টার। এখন ১০টি শাখা। আমাদের রায়ান্স থেকে যেহেতু প্রচুর মানুষ কম্পিউটার ও কম্পিউটার পণ্য কিনছেন, তাঁরা ওয়ারেন্টির পর যাতে সার্ভিস পান, সে জন্যই রায়ান্স কেয়ার। আমাদের বাইরে থেকে যাঁরা কিনছেন, তাঁদেরও তো সার্ভিসিং প্রয়োজন। এসব ভেবে রায়ান্স কেয়ারের জন্ম।

প্রথম আলো:

আপনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর তখন (১৯৯৯) বিসিএস কম্পিউটার সিটি প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে আপনার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের মতো দেশে শুধু কম্পিউটারের জন্য এত বড় বিশেষায়িত বাজার গড়ার প্রয়োজনীয়তা কি ছিল?

আহমেদ হাসান: বাংলাদেশের মতো বিশৃঙ্খল দেশে, যদি কোনো ব্যবসা ভালো করতে চান, তবে বাজার সুশৃঙ্খল করা দরকার। বাজার জনগণ নিয়ন্ত্রণ করবে। কোনো ব্যক্তি বা আমলা নন। আইটিতে (তথ্যপ্রযুক্তি) ভালো কিছু করতে সুশৃঙ্খল বাজার দরকার সবার আগে। আমরা তো বেশি কিছু করতে পারব না, তাই ভাবলাম, একটি ভালো মার্কেট তৈরি করি। এটা পুরো দেশের কম্পিউটার বাজারে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।  

প্রথম আলো:

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ও বেসিসে আপনি একসময় খুব সক্রিয় ছিলেন। এখন নিষ্ক্রিয় কেন?

আহমেদ হাসান: এখন নতুন নেতৃত্ব এসেছে। কম্পিউটার সমিতির এখন অন্য কাজ, ফোকাস পরিবর্তন হয়েছে। আমার আর সংগঠনগুলোর অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়েছে। আমরা যখন ছিলাম, তখন কম্পিউটার সমিতি সেক্টরের প্ল্যাটফর্ম ছিল। শুধু ব্যবসায়ীদের সমিতি ছিল না। সংগঠনের সামাজিক প্রভাব ছিল। এখন সেটি কম বলে মনে হয়।

প্রথম আলো:

প্রযুক্তিগতভাবে মোবাইল ফোনের ব্যাপক উত্থানের কারণে কি কম্পিউটারের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে?

আহমেদ হাসান: প্রযুক্তি হিসেবে মোবাইল ফোন যদি পৃথিবীতে না আসত, তবে ডেস্কটপ/ল্যাপটপ কম্পিউটার এখন অন্য জায়গায় যেত। কম্পিউটার একসময় সমাজে বিপ্লব এনেছিল। এখন কম্পিউটার মোবাইল ফোনের সহযোগী হয়ে গিয়েছে।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প এখন কোন জায়গায়? এটিকে আগের তুলনায় কি অগ্রসর বলবেন?

আহমেদ হাসান: তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যথেস্ট অগ্রগতি ঘটেনি। এটা অনেক গুণ বড় হওয়া উচিত ছিল। তবে ভবিষ্যতে এটা ঘটবে বলে মনে করি। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প আরও বড় হবে।

প্রথম আলো:

অবসরে কী করেন?

আহমেদ হাসান: বই পড়ি। আমার প্রিয় বিষয় ইতিহাস। আমার কাছে তিনটি নির্ধারক সময় মনে হয়— ১৯০৫ (বঙ্গভঙ্গ), ১৯৪৭ (ভারত ও পাকিস্তান ভাগ) এবং ১৯৭১ (বাংলাদেশের অভ্যুদয়)।

প্রথম আলো:

আর ২০২৪?

আহমেদ হাসান: এটা এমন একটা ঘটনা, যা আগে ঘটেনি। এখানে ছেলে বা মেয়ে মা–বাবাকে চিঠি লিখে এসেছে ‘আমি প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি। আমি ফেরত না–ও আসতে পারি।’ হাজার হাজার ছেলেমেয়ে তাদের মোবাইলের হোমস্ক্রিনে তাদের নম্বর, মা–বাবার নাম–ঠিকানা ও ব্লাড গ্রুপ লিখে রেখেছে। তারা মোবাইল শরীরের সঙ্গে রেখেছে, তার মানে তারা মারা যেতে পারে। ধরুন, এক হাজার জন মারা গেছে, ১০ হাজার জন মারা যেতে পারত। ২০ হাজার আহত হয়েছে, এটা এক লাখ হতে পারত। ২০২৪ এক অন্য মাত্রার বিষয়।

প্রথম আলো:

আপনাকে ধন্যবাদ।

আহমেদ হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।