দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কে? কোনো বিশেষ প্যানেল নয়, কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীও নন; ক্ষতিটা হচ্ছে সেই তরুণ উদ্যোক্তার, যে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি সফটওয়্যার কোম্পানি দাঁড় করানোর স্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরেমশন সার্ভিসেস বা বেসিস তো কেবল একটি সাধারণ ব্যবসায়ী সংগঠন নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের নীতি নির্ধারণ ও বৈশ্বিক স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় জায়গা। অথচ দুই বছর ধরে এ সংগঠনটি আটকে আছে প্রশাসক, সহায়ক কমিটি আর স্থগিতাদেশের এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায়।
একটি নির্বাচন ঘিরে যখন বারবার এমন নাটকীয়তা তৈরি হয়—এক দিন প্রার্থিতা বাতিল আর তার পরদিনই তফসিল স্থগিত, তখন সংগঠনের কাঠামোগত দুর্বলতা আর আস্থার সংকটটাই তীব্রভাবে সামনে আসে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা কি এতটাই জটিল কোনো সমীকরণ ছিল যে তফসিল ঘোষণার আগে তার সমাধান করা গেল না? ঠিক ভোটের আগমুহূর্তে এই ঘাটতিগুলোর পুনরাবৃত্তি পুরো খাতের পেশাদারত্বকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাস্তবতা হলো, প্রশাসক বদলের বৃত্তেই যেন বন্দী হয়ে পড়েছে দেশের শীর্ষ এই বাণিজ্য সংগঠনটি। বিগত সময়ে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, সম্প্রতি (৩ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনকে আগামী চার মাসের জন্য নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২-এর ১৭ ধারা মোতাবেক এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, মেয়াদ শেষে কেবল প্রশাসক পরিবর্তনের মাধ্যমেই কি সংকটের সমাধান সম্ভব?
আজ যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গ্লোবাল আউটসোর্সিং আর বিদেশি বিনিয়োগ টানার জন্য একটি সক্রিয় ও নির্বাচিত নেতৃত্বের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেখানে প্রযুক্তি খাতের নেতৃত্ব ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর কমিটি টিকিয়ে রাখার হিসাব-নিকাশে। একের পর এক সহায়ক কমিটি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসক-নির্ভরতা দিয়ে কোনো বৃহৎ অ্যাসোসিয়েশন কার্যকর রাখা যায় না; এতে কেবল নীতিগত স্থবিরতাই বাড়ে।
১৯৯৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় সফটওয়্যার খাতের এই বাণিজ্য সংগঠন। বেসিসের প্রতিষ্ঠাতাকালীন সভাপতি এম এ তৌহিদ কিছুদিন আগে প্রথম আলোকে আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘অনেক হয়েছে, যা দেখছি তাতে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষের জন্য ভালো কিছু হবে না। আমার কথা হলো, পুরোনো ও নতুন—সবাই মিলে বসুন, নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করুন। একটা সিদ্ধান্তে আসুন। যদি বেসিস চান, তবে সঠিকভাবে পরিচালনা করুন; আর না চাইলে যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, হতে দিন। আমার বয়স ৮৩ বছর চলছে, হয়তো চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু বেসিসের জন্য পরামর্শ চাইলে আমি এখনো তা দিতে প্রস্তুত।’
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত যাঁদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে, তাঁদের অন্যতম আব্দুল্লাহ এইচ কাফি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘খারাপ লাগে যখন আমার দেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক আলোচনা হয়। অ্যাসোসিও কিংবা উইটসার মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যখন আমাদের ছোট করে দেখা হয়, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন। আমি শুধু অনুরোধ করব—অনেক হয়েছে, এবার নিজেদের স্বার্থের জন্য পুরো খাতটির আর ক্ষতি করবেন না।’
গত ২৯ আগস্ট প্রথম আলোতে ‘অবশেষে হচ্ছে বেসিস নির্বাচন, ১১টি পদে ২৬ প্রার্থী’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর সাধারণ সদস্যরা প্রত্যাশা করেছিলেন দ্রুত সংকটের অবসান হবে। সে নির্বাচন প্রক্রিয়াও বাতিল করা হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠছে বারবার। ফলে প্রশ্ন জাগে, বেসিস কি তবে অভ্যন্তরীণ সংকীর্ণ রাজনীতির বেড়াজালেই আটকে থাকবে?
এপ্রিলে ঘোষিত বেসিস নির্বাচনে মনোনয়নপত্র চুরির অভিযোগের মতো অত্যন্ত গুরুতর ও অনভিপ্রেত ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি ছিল। অথচ তা না করে পরবর্তী সময়ে জুনে ঘোষিত তফসিলের নির্বাচনও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই বন্ধ বা স্থগিত করে দেওয়া হলো। বারবার নির্বাচন না হওয়া নিয়ে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সদস্যরা জানতে চান—কেন বারবার নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর জবাবদিহিই বা কোথায়? অভিভাবক মন্ত্রণালয় হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে এখন সদস্যদের একটাই দাবি—পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পেছনের কারণগুলোর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ব্যর্থতার দায় চিহ্নিত করে স্পষ্ট জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আর কত দিন এমন অভিভাবকহীন রাখা হবে? সংকীর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ ভুলে অনতিবিলম্বে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বেসিসের নেতৃত্ব সাধারণ সদস্যদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই এখন উত্তরণের একমাত্র পথ। নতুন প্রশাসনের অধীন আগামী চার মাসের সময়সীমা যেন নতুন কোনো স্থগিতাদেশের ফাঁদে না পড়ে, বরং একটি কার্যকর নির্বাচিত বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়—সাধারণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের এখন এটুকুই চাওয়া।