
অধ্যায়-৩
প্রিয় শিক্ষার্থী, আজ জীববিজ্ঞান ২য় পত্রের অধ্যায়-৩ থেকে একটি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর দেওয়া হলো।
# চৌধুরী সাহেব এখন নিরামিষ-জাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করেন। হজমের সমস্যার কারণে তিনি আমিষ-জাতীয় খাবার খান না। এমনকি অতিরিক্ত তেল, চর্বি বা ঘি-জাতীয় খাদ্যও পরিহার করেন।
প্রশ্ন:
ক. পরিপাক কী?
খ. খাদ্য বিপাকে অগ্ন্যাশয় গুরুত্বপূর্ণ কেন?
গ. চৌধুরী সাহেবের গ্রহণকৃত খাদ্যের পরিপাক প্রণালি বর্ণনা করো।
ঘ. চৌধুরী সাহেবের অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পরিহারের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ক. যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জটিল খাদ্যবস্তু এনজাইমের সহায়তায় ভেঙে জীবদেহের বিপাকক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য সরল, দ্রবণীয় ও শোষণযোগ্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয়, তাকে পরিপাক বলে।
উত্তর: খ. অগ্ন্যাশয় একাধারে বহিঃক্ষরা ও অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি হিসেবে কাজ করে। বহিঃক্ষরা গ্রন্থি হিসেবে এটি অগ্ন্যাশয় রস ক্ষরণ করে তাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট-জাতীয় খাদ্য পরিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম ক্ষরণ করে। ফলে সহজেই বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
উত্তর: গ. চৌধুরী সাহেব নিরামিষভোজী। সুতরাং তাঁর পছন্দের খাবারগুলো কার্বোহাইড্রেট-জাতীয়। ভাত, রুটি, আলু মূলত কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাদ্য। নিচে কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাদ্যের পরিপাক বর্ণনা করা হলো:
মুখবিবরে পরিপাক: খাদ্য চিবানোর সময় লালাগ্রন্থি নিঃসৃত লালারস খাদ্যবস্তুর সঙ্গে মিশে খাদ্যকে নরম করে। লালারসে টায়ালিন নামক শর্করা, আর্দ্রবিশ্লেষী এনজাইম পাওয়া যায়। টায়ালিন এনজাইম স্টার্চ, গ্লাইকোজেন ও ডেক্সটিন অণুকে আর্দ্রবিশ্লিষ্ট করে প্রথমে দ্রবণীয় স্টার্চে এবং ক্ষুদ্রতর ডেক্সটিন অণুতে রূপান্তরিত করে। অবশেষে স্টার্চের অ্যামাইলেজ অংশ থেকে মলটোজ, মলটোট্রায়োজ ও এমাইলোপেকটিন অংশ থেকে মলটোজ, মলটোট্রায়োজ ও আইসোমলটোজ উৎপন্ন হয়। টায়ালিনের ক্রিয়া মুখবিবরে আরম্ভ হলেও এর পরিপাক প্রধানত পাকস্থলীতে সংগঠিত হয়।
পাকস্থলীতে পরিপাক: পাকস্থলীর পাচক রসে কার্বোহাইড্রেট পরিপাককারী এনজাইম নেই। তবে পাকস্থলী নিঃসৃত Hce কিছু ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।
ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক: কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাদ্য ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছালে তা অগ্ন্যাশয় রস ও আন্ত্রিক রসের ক্রিয়ায় পরিপাক হতে থাকে।
অগ্ন্যাশয় রসের ক্রিয়া:
১. অগ্ন্যাশয়িক অ্যামাইলেজ ক্লোরাইড আয়ন সামান্য ক্ষারধর্মী পরিবেশে স্টার্চ, গ্লাইকোজেন ও ডেক্সটিনকে আর্দ্রবিশ্লিষ্ট করে মলটোজ, মলটোট্রায়োজ ও লিমিট ডেক্সটিন নামক ডেক্সটিন অণু তৈরি করে।
২. মলটেজ এনজাইম মলটোজের ওপর ক্রিয়া করে গ্লুকোজে পরিণত করে।
আন্ত্রিক রসের এনজাইমের ক্রিয়া:
১. আন্ত্রিক অ্যামাইলেজ: স্টার্চ, ডেক্সটিন প্রভৃতি পলিস্যাকারাইডকে আর্দ্রবিশ্লিষ্ট করে মলটোজ, মলটোট্রায়োজ ও ক্ষুদ্র ডেক্সটিনে পরিণত করে।
২. আইসোমলটেজ: আইসোমলটোজকে ভেঙে মলটোজ ও গ্লুকোজ উৎপন্ন করে।
৩. মলটেজ: মলটোজকে ভেঙে গ্লুকোজ উৎপন্ন করে। ৪. সুক্রেজ: সুক্রোজ নামক ডাইস্যাকারাইডকে ভেঙে এক অণু গ্লুকোজ ও এক অণু ফ্রুক্টোজ উৎপন্ন করে।
৫. ল্যাকটোজ: দুধের ল্যাকটোজ নামক ডাইস্যাকারাইডকে ভেঙে এক অণু গ্লুকোজ ও এক অণু গ্যালাকটোজ উৎপন্ন করে। এভাবে প্রস্তুত মনোস্যাকারাইড পরবর্তী সময়ে শোষিত হয়।
উত্তর: ঘ. মানুষের পরিপাকগ্রন্থি নিঃসৃত এনজাইমসমূহ বিভিন্ন খাদ্যবস্তুকে ভেঙে সেগুলোকেও শোষণ উপযোগী করে। অনেক সময় দেখা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের লিপিড-জাতীয় খাদ্য পরিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলোর ক্ষরণ কমে যায়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী সাহেবের পাচক রসে লাইপেজ, অগ্ন্যাশয় রসে লাইপেজ, লেসিথিনেজ ইত্যাদি এবং পিত্তরসে পিত্তলবর্ণের পরিমাণ কমে গেছে। এ এনজাইমগুলো লিপিড-জাতীয় খাদ্যের পরিপাকে অংশগ্রহণ করে। যখন চৌধুরী সাহেবের পরিপাকগ্রন্থি থেকে লিপিড-জাতীয় খাদ্য পরিপাককারী এনজাইমগুলো ঠিকমতো ক্ষরিত হতো, তখন হজমে সমস্যা হতো না। বর্তমানে তাঁর পরিপাকগ্রন্থি থেকে লিপিড পরিপাককারী এনজাইমগুলো ঠিকভাবে ক্ষরিত হচ্ছে না। তাই তিনি লিপিড-জাতীয় খাদ্য হজমের সমস্যায় ভুগছেন এবং অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করছেন। এ ছাড়া অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবারে কোলেস্টেরল থাকায় তা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে চৌধুরী সাহেবের অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পরিহার যৌক্তিক ছিল।
প্রভাষক, রূপনগর মডেল স্কুল ও কলেজ, ঢাকা