ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে হলে

ফ্রিল্যান্সিং কাজের চাহিদা বাড়ছে
ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং। এই মুক্ত পেশায় তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বেশি। ঘরে বসে বিদেশের তথ্যপ্রযুক্তির নানা কাজ করে আয় করেন ফ্রিল্যান্সার বা মুক্ত পেশাজীবীরা। কিন্তু শুরুটা কীভাবে করতে হবে, ফ্রিল্যান্সার হতে কী জানতে হবে—এ নিয়ে দ্বিধা অনেকের। অনেকে সঠিক দিকনির্দেশনাও পান না। ফ্রিল্যান্সিং করতে চান, এ ব্যাপারে আগ্রহ আছে—এমন পাঠকদের জন্য শুরু হলো ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ‘ফ্রিল্যান্সিং যেভাবে’। আজ থাকছে চতুর্থ পর্ব।

পর্ব-৪

শুধু কাজ জানলেই ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে সফল হওয়া যায় না। মূল কাজের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে টিকে থাকতে হলে আরও বেশ কিছু বিষয়ে দক্ষতা আয়ত্ত করতে হয়। সফল ফ্রিল্যান্সার হতে হলে নিচের বিষয়গুলো ভালোভাবে জানতে হবে।

দক্ষতা

আপনি যে বিষয়ে কাজ করতে চান, সে বিষয়ে (ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, নিবন্ধ লেখা ইত্যাদি) ভালোভাবে দক্ষ হতে হবে। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয় তাই আপনার দক্ষতাও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আন্তর্জাতিক মানের শুনেই ভেবে বসবেন না আপনাকে সবচেয়ে সেরা হতে হবে। তবে আপনার দক্ষতা ও পেশাগত আচরণ যত ভালো হবে, অনলাইনে তত বেশি কাজ পাওয়া যাবে। নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আপনি যে বিষয়ে দক্ষ সে বিষয়ে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ফোরাম এবং কমিউনিটি গ্রুপে নিজের করা বিভিন্ন কাজ পোস্ট করুন। আপনার কাজের মান কেমন হয়েছে তা জানতে চান। কমিউনিটির অন্যান্য সদস্যদের মতামত পর্যালোচনা করে নিজের দুর্বলতা দূর করুন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে আপনার দক্ষতার বিষয়ে কোনো ধরনের কাজ পোস্ট করা হচ্ছে সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখুন। পোস্ট করা কাজের চাহিদা অনুযায়ী আপনার কোনো দুর্বলতা আছে কী না তা যাচাই করে সে বিষয়ে অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়মিত চর্চা করতে হবে। সম্ভব হলে আপনার আশপাশে থাকা পরিচিত সফল ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তা নিন। এভাবে কাজ করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আপনার কাজের মান আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে।

আরও পড়ুন

মার্কেটিং দক্ষতা

ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়ার জন্য আপনি যেসব বিষয়ে দক্ষ, তা সবাইকে জানান দেওয়ার পাশাপাশি নিজের করা কাজগুলো প্রচার করতে হবে। এ জন্য ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ করার জন্য আপনাকে শুরুতেই সুন্দর প্রোফাইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। সুন্দর প্রোফাইল লেখার কৌশল নিয়ে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব। আজকের পর্বে নিজের দক্ষতা প্রচারের জন্য প্রোফাইলে কোন কোন বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে, তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

সুন্দর প্রোফাইল লেখার জন্য নামের পরপরই আপনার ভালো মানের প্রফেশনাল হেডশট ছবি যুক্ত করতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, প্রোফাইল পড়েই আপনার সম্পর্কে ক্লায়েন্টরা ধারণা নেবে আপনি তাদের কাজ করতে পারবেন কি না। আর তাই প্রোফাইলে বিস্তারিতভাবে আপনার দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের তথ্য লিখতে হবে। পাশাপাশি আপনি যেসব বিষয়ে দক্ষ, সে কাজগুলোর কি–ওয়ার্ডগুলো নির্বাচন করে প্রোফাইলে যুক্ত করতে হবে।

ফাইবার বা গিগনির্ভর মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে চাইলে আপনার করা গিগের বিস্তারিত তথ্য লিখতে হবে, যেন ক্লায়েন্টরা সহজে আপনার দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে ভালো ধারণা পেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি কাজের জন্য আপনার আলাদা কভার লেটার করতে হবে। কভার লেটারের সঙ্গে ভুলেও অন্যের তৈরি করা টেমপ্লেট ব্যবহার করা যাবে না। সব মার্কেটপ্লেসেই সাধারণত নিজের পোর্টফোলিও যুক্ত করার একটি অপশন থাকে, সেখানে নিজের করা বেশ কিছু কাজের বিস্তারিত তথ্য (ছবি ও কেস স্টাডি) যুক্ত করতে হবে। প্রোফাইল মার্কেটিংয়ের জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগের সাইটেও নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে।

আরও পড়ুন

যোগাযোগ

আপনি যতই দক্ষ হোন না কেন, যোগাযোগ দক্ষতা না থাকলে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে কাজের অর্ডার পাওয়া বেশ কষ্টকর। এ জন্য আপনাকে অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও লেখায় দক্ষ হতে হবে। আলোচনার সময় কাজের বাইরে কোনো বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট করা যাবে না। ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে আপনি কীভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারবেন, সে বিষয়েই আলোচনা করতে হবে। অর্থাৎ ক্লায়েন্টকে বোঝাতে হবে আপনি তার দেওয়া কাজটি করতে পারবেন। নিজের কাজের বিশ্লেষণ এবং আপনার পারদর্শিতা দুটিই বোঝাতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতা রাতারাতি আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। এ জন্য যথেষ্ট সময় এবং নিয়মিত অনুশীলন করার প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ইংরেজিতে কথা বলে নিজের পরিচিতি ভালোভাবে উপস্থাপন করার চর্চা করতে হবে। এ পদ্ধতিতে অল্প সময়ের মধ্যেই ইংরেজিতে কথা বলার আড়ষ্টতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, যা পরবর্তী সময়ে ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ নিয়ে আলোচনার সময় আপনাকে সহায়তা করবে।

একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে যোগাযোগ মানে শুধু ইংরেজিতে কথা বলার পারদর্শিতা নয়, ক্লায়েন্ট কোন ধরনের কাজ আপনাকে দিয়ে করাতে চাচ্ছেন, সে বিষয়েও পুরোপুরি বুঝতে হবে আপনাকে। শুধু তা–ই নয়, প্রকল্প জমা দেওয়া পর্যন্ত ক্লায়েন্টের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

পেশাদারত্ব

যেকোনো কাজে সফল হওয়ার জন্যই পেশাদারত্ব থাকা প্রয়োজন। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে বিষয়টির গুরুত্বও রয়েছে বেশ। কারণ, এখানে ক্লায়েন্ট আপনাকে সরাসরি না দেখেই কাজ দেন। ফলে কাজের মান এবং পেশাদারত্বই ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে আপনার সফলতার জন্য বেশি ভূমিকা রাখবে। এ জন্য ক্লায়েন্টকে আপনি যে সময়ে কাজ জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন, সে সময়ের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি কাজ জমা দেওয়ার আগেই ক্লায়েন্টকে নিয়মিত কাজের হালনাগাদ তথ্য জানাতে হবে। কায়েন্টের সঙ্গে কাজের আলোচনার সময় ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো।

কাজ জমা দেওয়ার পর সেবা

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ জমা দিয়েছেন, ক্লায়েন্টও অর্থ পরিশোধ করে ভালো রেটিং দিয়েছে আপনাকে। কিন্তু কাজ জমা দেওয়ার দিন কয়েক পরে হঠাৎ করেই ক্লায়েন্ট বলল, তার ছোট একটা সমস্যার সমাধান করে দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কাজটি যত ছোটই হোক না কেন, আপনাকে অবশ্যই সমাধান করে দিতে হবে। এতে ক্লায়েন্টের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ভালো হবে। ফলে ভবিষ্যতে ক্লায়েন্ট বড় কোনো কাজ করানোর সময় আপনাকে প্রাধান্য দেবে। মনে রাখতে হবে, ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে সাধারণত ক্লায়েন্টরা যত ছোট কাজই করান না কেন, অর্থ ঠিকই পরিশোধ করেন। এ জন্য কাজ শেষ করার পর কোনো ক্লায়েন্ট সাহায্য চাইলে আপনি দ্বিধা ছাড়াই করে দিতে পারেন।

বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিই। ধরুন, আপনি এক মাস আগে ক্লায়েন্টের জন্য একটা লোগো তৈরি করে দিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই সেই ক্লায়েন্ট বলল, আমাকে লোগোটার একটা সাদাকালো সংস্করণ তৈরি করে দাও। সহজ এই কাজ আপনি বিনা মূল্যে করে দিতে পারেন। এর মাধ্যমে ক্লায়েন্টের সঙ্গে আপনার ভালো সম্পর্ক তৈরি হবে এবং তার সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। তবে কাজের পরিমাণ যদি বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আগে থেকে চার্জ বলে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভালো সম্পর্ক তৈরির জন্য বিনা মূল্যে সব কাজ করা যাবে না।

নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধি করা

আপনি যতই দক্ষ হোন না কেন, নিয়মিত সেই বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য শিখতে হবে। পাশাপাশি আপনার দক্ষতার বিষয়ে নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে কি না, তা–ও জানতে হবে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এনএফটি সার্ভিস নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। চাহিদা থাকায় এ ধরনের কাজের মূল্যও গতানুগতিক অন্য কাজের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এনএফটির মধ্যে গ্রাফিকসের পাশাপাশি ওয়েব ডেভেলপমেন্টেরও কাজ হয়ে থাকে। যেসব ফ্রিল্যান্সার এ বিষয়ে শুরুর দিকে পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা এখন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে বেশি আয় করতে পারছেন।

ধৈর্য

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ভালো করতে হলে অনেক বেশি ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। প্রথম ৬ থেকে ১২ মাস আয়ের পরিমাণ খুবই কম হয়ে থাকে। এই সময়টা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা না করে অনেকেই কাজ করা ছেড়ে দেন। তবে সফল হতে হলে এই সময়টা ধৈর্য ধরে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

লেখক: আপওয়ার্ক টপ রেটেড প্লাস ফ্রিল্যান্সার
পরের পর্ব: ফ্রিল্যান্স কাজের জন্য কেমন কম্পিউটার প্রয়োজন