মাইক্রোসফটে সুমনের গবেষণা

স্মার্টফোন ব্যবহার করেন কিন্তু ব্যাটারির চার্জ নিয়ে সমস্যায় পড়েননি—হলফ করে এমন কেউ কি বলতে পারবেন? মুঠোফোনে ব্যাটারির চার্জ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়াটা এখন যেন বৈশ্বিক সমস্যাই। বিশেষ করে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে। এই সমস্যা সমাধানে গবেষণা চলছে মাইক্রোসফট রিসার্চে। সেই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন বাংলাদেশের সুমন কুমার নাথ। মাইক্রোসফট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ গবেষক তিনি।
চার বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে। ২০ নভেম্বর কথা হয় তরুণ এই গবেষকের সঙ্গে। জানালেন তাঁর এখনকার গবেষণা নিয়ে। ‘একবার চার্জ দিলে যেন সারা দিন মুঠোফোন চলে, এমন হলেই অনেকে খুশি থাকেন। কিন্তু আমরা গবেষণা করছি এমন কিছু করতে, যাতে একবার চার্জ দিলে পুরো সপ্তাহ ধরে মুঠোফোন চলতে পারে। এটা এমন এক গবেষণা, যা সফল হলে সারা বিশ্বের মুঠোফোন ব্যবহারকারীরাই এর সুফল পাবেন।’
বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা মাইক্রোসফট করপোরেশনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো মাইক্রোসফট রিসার্চ। সুমন বললেন, ‘শুনে মনে হতে পারে এখানে শুধু মাইক্রোসফটের প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে গবেষণা হয়। আসলে তা নয়, এখানে পণ্য নিয়ে যেমন গবেষণা হয়, তেমনি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছাড়াও গবেষণা হয় এখানে। অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতো।’ তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট রিসার্চই এখন সবচেয়ে বড় গবেষণাগার। বিশ্বের ১১টা জায়গায় আছে গবেষণাগার। এর মধ্যে সিয়াটলে সবচেয়ে বড়টি। ৫৫ বিষয়ে গবেষণা হয় এখানে। তথ্যপ্রযুক্তির নোবেল হিসেবে খ্যাত টুরিন পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার আছে মাইক্রোসফট রিসার্চের ঝুলিতে। সুমন নাথ সিয়াটলের গবেষণাগারেই কাজ করেন।
আপনি তো সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং নিয়েই কাজ করেন বেশি, কিন্তু ব্যাটারি তো হার্ডওয়্যারের মধ্যে পড়ে। সুমন বলেন, ‘স্মার্টফোনের অনেক অ্যাপ আছে, যেগুলো চার্জ দ্রুত শেষ করে ফেলে। ফলে সফটওয়্যারে কাজ করে ব্যাটারির আয়ু বাড়ানো যায়।’

আজকের গবেষক সুমন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সেরা ছাত্রদের একজন হিসেবে। বুয়েটের অধ্যাপক এম কায়কোবাদ জানান, সুমন বুয়েটের প্রথম ছাত্র যে সিজিপিএ পুরো ৪ পেয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন এসিএম আইসিপিসির চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম দলের সদস্য ছিলেন সুমন। ১৯৯৮ সালে কম্পিউটার কৌশল বিভাগ থেকে পাস করার পরই যোগ দেন বুয়েটে প্রভাষক হিসেবে। এক বছর পরই চলে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেনে। এখানে এক সেমিস্টার পড়ে সুমন চলে যান কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নেন পিএইচডি ডিগ্রি। ছাত্র থাকার সময়ই ইন্টেলের গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে আছেন মাইক্রোসফট রিসার্চে।
ফেনীর শিক্ষক দম্পতি মানিক লাল নাথ ও মুক্তি নাথের তিন সন্তানের মধ্যে মেজো সুমনের জন্ম ১৯৭৪ সালে। অন্তত ১০টা আন্তর্জাতিক সেমিনারে ‘বেস্ট পেপার’ পুরস্কার পেয়েছে সুমনের গবেষণাপত্র। তাঁর গবেষণাপত্র তথ্যসূত্র হিসেবে (সাইটেশন) ব্যবহৃত হয়েছে তিন হাজার ৬০০ গবেষণাপত্রে। সুমন বললেন, ‘বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করা দরকার। বিশেষ করে কম্পিউটার বিজ্ঞানে গবেষণা করতে বেশি অর্থও লাগে না।’
২০০৫ সালে সুমন বিয়ে করেন অনিন্দিতা দাশ তালুকদারকে। বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলের স্নাতক অনিন্দিতা এখন যুক্তরাষ্ট্রেই কাজ করছেন একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে। এই দম্পতির সন্তান আয়ুষ্মান নাথের বয়স দুই বছর।
স্মার্ট যন্ত্রপাতির ব্যাটারি নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সুমন এখন বিশাল আকারের তথ্য বা বিগ ডেটা বিষয়েও কাজ করছেন। বিশেষ করে ক্লাউড কম্পিউটিং। তিনি বললেন, ‘ফেসবুক বা টুইটারের মতো মাধ্যমের বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করে ইবোলার মতো ভাইরাস সম্পর্কে দ্রুত খবর জানা যাবে।’ সুমনদের এই গবেষণাও কাজে লাগবে সবার। তিনিও এ রকম গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে চান। বললেন, ‘পাশাপাশি বাংলাদেশকে গবেষণার এই বড় ক্ষেত্রের মধ্যে আনতে চাই।’