রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে...

অাঁকা: ষুভ
অাঁকা: ষুভ

বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। ভাবলাম, বৃষ্টি নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই। গুগলে দু-একটা কবিতাও খুঁজতে শুরু করলাম। যেই না স্ট্যাটাস টাইপ করতে যাব, অমনি বাঁ কাঁধের পেছন থেকে কেউ বলে উঠল, ‘হিপোক্র্যাট! সবাই হিপোক্র্যাট!’
‘কে! কে কথা বলছে?’ ভীষণ আঁতকে উঠেছি, ফলে আপনাআপনি প্রশ্নটা বেরিয়ে এল মুখ থেকে।
: বেশ তো! আমাকে এখন আর চিনবেন কেন! আমি রোদ।
: মানে? কোন রোদ? কিসের রোদ?
: এখন কি আর আমাকে চিনবেন! চমৎকার বৃষ্টি পড়ছে, সবকিছু ভুলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। বৃষ্টিকে নিয়ে এখন রোমান্টিক স্ট্যাটাস দেবেন আপনারা। চেনা হয়ে গেছে আপনাদের। আপনারা সব হিপোক্র্যাট! রাস্তাঘাট যখন পানিতে তলিয়ে যাবে, তখন আমাকে আবার মনে পড়বে। যখন এক ফালি রোদের আশায় কাঁদবেন, তখন চিনবেন আমাকে; এখন না।
রোদ কথা বলছে, এটা ঠিক মেনে নিতে না পারলেও জবাবে বললাম, ‘হিপোক্র্যাট কেন হতে যাব আমরা!’
: হিপোক্র্যাট নয়তো কী? ঢাকা শহরের মেয়র পারলে এখন রাস্তাঘাট শুকনো রাখুক দেখি। এই যে আমি রাস্তাঘাট সব শুকনো রাখি। আমার জন্য পরিষ্কার আকাশটা দেখেন। আর বৃষ্টি পড়লেই খুশিতে আপনারা বাকবাকুম! বৃষ্টিকে নিয়ে স্ট্যাটাসও রচনা হচ্ছে দেদার। এটা হিপোক্রেসি নয়তো কী? কই, আমাকে নিয়ে তো এক-আধ দিন এক আধখানা স্ট্যাটাসও দিতে দেখলাম না!’
: ও আচ্ছা, এই কথা! টেনশন করবেন না, আপনাকে নিয়ে এখনই একটা স্ট্যাটাস লিখছি।’
এবার যেন রোদের মনটা গলল! নরম গলায় বলল, ‘স্ট্যাটাসে বৃষ্টির অপকারিতা নিয়ে লিখতে ভুলবেন না যেন।’
‘আসলেই! বৃষ্টিটা বড় জ্বালাচ্ছে!’ এই বলে আমি যখনই বৃষ্টির অপকারিতা আর রোদের উপকারিতা নিয়ে একটা স্ট্যাটাস লিখতে গেলাম, তখনই দেখি ডান কাঁধের পেছন থেকে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। আর ভেসে এল আরেকটা কণ্ঠ, ‘বাহ্! আমার অপকারিতা নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে দেখি! হিপোক্রেসি অ্যান্ড ইটস বেস্ট!’
আমি এবার আগের তুলনায় কম অবাক। ফলে বেশ খানিকটা শান্ত স্বরে জানতে চাইলাম, ‘কে আপনি? ওহ্, বৃষ্টি? আপনি আবার হিপোক্রেসি হিপোক্রেসি শুরু করলেন কেন?’
: করব না? যখন রোদ উঠবে, গরমে অতিষ্ঠ হবেন, আমার জন্য কান্নাকাটি করবেন। আর এখন আমি এলাম, তা আপনার সহ্য হচ্ছে না! রোদে জ্বলেপুড়ে মরতে বেশ ভালো লাগত, তাই না? স্ট্যাটাস দেবেন রোদ নিয়ে! বেশ, দিন তাহলে। কিন্তু এরপরের বার আমাকে ডাকার আগে মনে থাকে যেন ব্যাপারটা!
এবার আর উত্তর দিতে হলো না। বাঁ পাশ থেকে বাংলা সিনেমার স্টাইলে হুংকার দিলেন স্বয়ং রোদ, ‘উপকার! এর নাম উপকার? পানিতে শহর-বন্দর-গ্রাম—সব ভাসিয়ে নিয়ে তিনি এসেছেন উপকার করতে! নালা-নর্দমার পানিতে সব ভেসে যাচ্ছে, মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না, এর নাম উপকার? এই উপকারের আমি নিকুচি করি! দেখুন, ওর কথা শুনবেন না, যত্ত সব ফালতু! দেশের মানুষের মাথা এরাই খেল, আপনি আমাকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিন। বেশ তো ঘটা করে বৈশাখ বরণ করেন, এখন আবার রোদ সহ্য হবে না কেন?’
: হায় হায় রে! রোদ বলছে উপকারের কথা! এ-ও শুনতে হলো! রোদের জ্বালায় কি মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারে? ঘামের দুর্গন্ধ তো রাস্তার ডাস্টবিনের চেয়েও ভয়াবহ! আপনি আমার কোন ঘণ্টার উপকারটা করেন, শুনি? আর আমার কেবল দুর্বল দিকগুলোই দেখলেন তো? দেখবেনই তো, আপনার যে রুচিই খারাপ। আমার কারণে কত মানুষ কবি হয়, কত ফুল ফুটে, মাঠে ফসল ফলে, সে হিসাব আছে? এমন কোনো কবি আছে, যিনি আমাকে নিয়ে কবিতা লেখেননি? দেশ ও দশের উপকারে কোন দিনটায় আমি এগিয়ে আসিনি? যখনই আপনার জ্বালায় দেশবাসী অতিষ্ঠ ছিল, তখনই আমি এগিয়ে এসেছি সবার উপকারে। স্ট্যাটাস আমাকে নিয়েই তো দেবে, আপনাকে নিয়ে কেন!
: সব ট্র্যাজেডি! আসলে কেউ বুঝতেই পারল না, উপকার কী আর অপকার কী! দিনকে দিন মানুষের প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান তো লাটে উঠছে! জ্ঞানবিজ্ঞানে এরা যত উন্নত হচ্ছে, ততই যেন এদের বুদ্ধি কমছে! বৃষ্টিতে দুনিয়াদারি সব ভেসে যায়, আর এরা খুশি হয়ে স্ট্যাটাস দেয় মজার মজার! এর চেয়ে প্যাথেটিক ব্যাপার কী হতে পারে! না হলে যে রোয়ানুর মতো মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে এমন হামলা করল সে এলে কিনা মানুষ মহানন্দে খিচুড়ি রেঁধে খায়! সামওয়ান খিল মি প্লিজ!
: ইংরেজি কপচাবেন না, একদম ইংরেজি কপচাবেন না বলে দিচ্ছি। ট্র্যাজেডি হচ্ছেন আপনি, আমার কারণে তরুণ-তরুণী বৃষ্টিতে ভিজে প্রেম করে, আর আপনার জন্য ঘর থেকে বেরোনোর জো নেই। প্যাথেটিক তো আপনি...!

এভাবে চলতেই থাকল, চলতেই থাকল। একদিকে রোদ আরেকদিকে বৃষ্টি, আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি। ওদিকে আবার খেঁকশিয়ালটা দেখলাম ফেসবুকে লাইফ ইভেন্ট খুলল, ‘গেটিং ম্যারিড!’ চিৎকার করে উঠলাম আমি, ‘থামুন, আপনারা থামুন! আপনাদের জাহির করতে হবে না, কে ভালো, কে খারাপ। আর আমার স্ট্যাটাস আমি দেব, যাকে নিয়ে খুশি তাকে নিয়ে দেব।’ ধমকিটা মনে হয় কাজে দিল। রোদ-বৃষ্টি দুজনেই চুপ মেরে গেল। আমি একটা স্ট্যাটাস লিখতে শুরু করলাম, ‘রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে/ খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে...’