'পানিতে নামতে ডর করে'

মো. রাকিব হোসেন
মো. রাকিব হোসেন

বৈশাখের শেষ দিন। নগরজুড়ে মেঘহীন রোদের একচ্ছত্র প্রতাপ। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-লাগোয়া বুড়িগঙ্গার কালো-দুর্গন্ধময় পানিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একদল শিশু-কিশোর। তাদের লাফ-ঝাঁপ আর জলকেলি দেখে মনে হয়, দুপুরের গরমকে বুড়ো আঙুল দেখাতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শিশুদের এই দুরন্তপনা দেখে দেখে দৃষ্টি ছুটে যায় পাড়ে বসা নিঃসঙ্গ এক বালকের দিকে। সবাই যেখানে দুষ্টুমিতে ব্যস্ত, সেখানে ছেলেটি পাড়ে একাকী বসে কী করছে! এমন কৌতূহল থেকেই ছেলেটির সঙ্গে কথোপকথন।
কী নাম তোমার?
‘মো. রাকিব হোসেন।’একা বসে কী করছ?
‘বন্দুগো সাঁতার দেহি।’
তুমি বুঝি সাঁতার জানো না?
‘জানি, তয় পানিতে নামতে ডর করে।’
কেন?কোনো রা নেই রাকিবের মুখে। একমনে নখ দিয়ে মাটি খুঁটে খুঁটে মাথাটা আস্তে করে আরও নিচের দিকে নামিয়ে নেয়।কী হলো, কথা বলতে ভালো লাগছে না?
‘লাগতাছে।’
তবে বললে না তো, সাঁতার জানো অথচ পানিতে নামতে ভয় কিসের?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে কথা বলা শুরু করে রাকিব। এতক্ষণ কাটা কাটা উত্তর দিলেও এবার কথার ঝাঁপি খুলে বসে। রাকিব বলে, ‘আফা, আপনে পোশনো করনের লগে লগে আমার মনডা খারাপ অইয়া গ্যাছে। দাদির কথা মনে পরছে।’ এ পর্যন্ত বলে একটু থামে রাকিব। তারপর বলে, ‘আমার দাদির নাম সফুরজান। আমারে বাঁচাইতে গিয়া উনি মরছে।’

একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে, ‘আমরা বেড়িবাঁধ বরকতের বস্তিতে থাহি। ওই বস্তির ঘরগুলা ঝিলের ওপরে বাঁশ দিয়া বানানো। আমার যহন পাঁচ বচ্ছর বয়স, তহন আমি ঝিলের পানিতে পইরা গেছিলাম।’

তোমার পানিতে পড়ার সঙ্গে দাদির মৃত্যুর কী সম্পর্ক। কথা শেষ না করতেই ঠোঁট থেকে কেড়ে নিয়ে ছেলেটি বলে, ‘হেইডা এক বিরাট হিসটরি, আফা। কইতে সময় লাগব।’

যখন সে বুঝতে পারে আমার সময়ের তাড়া নেই, তখন স্মিত হেসে বলে, ‘এহানে অনেক রোইদ। চলেন, বুদ্ধিজীবীর ভিতরে যাই।’

আমরা স্মৃতিসৌধের ভেতরে গিয়ে বসি। আর এভাবেই মূল আলাপ জমে। রাকিব বলে চলে, ‘তহন বিষটির সময়। আমি আর আমার চাচা শামীম কাগজের নাও বানাইয়া খেলতাছিলাম। নাও বানাইয়া সুতায় বাইন্ধ্যা ঝিলে ছাড়তাম। আমাগো ঘরগুলা তো দেখছেন। পানির উপরে বাঁশ দিয়ে বানানো। আমরা খেলতাছিলাম আর আমার দাদি ঘরের সামনে বইয়া হাক কুটতেছিল, ফুবু ইচা মাছ। আর মায় তোশক রোইদে দিতে বাইর করছে। অনেক দিন বিষটির পর হেইদিন মেলা রোইদ উঠছিল।

‘একটার পর একটা নাও বানাই আর পানিতে ছাড়ি। উপুড় হইয়া নাও পানিতে ছাড়তে গিয়া নিজেই পানিতে পইরা যাই। ঝুম কইরা এট্টা আওয়াজ অইল। উপুড় হইয়া পড়ছিলাম। আমি তো তহন সাঁতার জানতাম না। যহন পরছি, তহন মনে অইল আমি বিছনায় হুইয়া আছি। কোই জানি উইড়া যাইতাছি। আর কিছু মনে নাই। বাকিডা পরে মার কাছে হুনছি।

‘আমারে পরতে দেইখ্যা মায় এক চিক্কইর দিছে, আহারে আমার পুত। চিক্কইর হুইন্যা দাদি হাতের বডি-হাক হালাইয়া এক লাফ দিছে ঝিলের পানিতে। দাদি আমারে উডাইতে পারে নাই। বাঁশের গোজ (কঞ্চি) প্যাডে ঢুইক্যা গেছে। আমার ফুবু তহন লাফাইয়া আমারে পানির তন উডাইছে। আর মার চিক্কইরে বস্তির মানুষ আইয়া দাদিরে উডাইছে। দাদির ভুঁড়ি বাইর হইয়া গেছিল। মায় কইছে, তহনও দাদি কইতেছিল, ওরে তোরা আমার নাতিরে বাঁচা।’

এটুকু বলে আবার থামে রাকিব। দরিদ্রতা আর মলিনতায় একাকার ছোট্ট মুখখানি। একটু পর আবার বলা শুরু করে। মনে হয় কথাগুলো এ ফাঁকে ভেবে নেয়, গুছিয়ে নেয়, ‘হাসপাতালে নিলে আমার দাদি মইরা যায়। আমি সাঁতার জানলে আমার দাদি মরত না, তাই না, আফা!’

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ১০ বছরের ছোট্ট ছেলেটি। ওর মুখজুড়ে অপরাধীর ছায়া। আমি ওকে বলি, তা কেন হবে, এটা একটা দুর্ঘটনা। এতে তোমার দোষ নেই!

অপরাধবোধ থেকে মনে হয় কিছুটা পরিত্রাণ মেলে ওর, ‘জানেন, আফা, এরপর বাবলু চাচায় আমারে সাঁতার শিখাইছে। আমি নদীতে সাঁতরাইতে পারি। এপারে তোন ওপারে যাইতে পারি। তয় ভয় করে। যদি ডুইব্যা যাই আর পানিতে নামলেই আমার দাদির মুখটা ভাইস্যা ওডে। এর লেইগ্যা নদীতে নামি না। বইয়া বন্দুগো সাঁতার দেহি। তয় এহনও মাজেমদ্যে হেদিনের কতা মনে পড়ে। তহন ডর লাগে। আমার দাদি মইরা গেল আর আমার খালি জ্বর-সর্দি অইল। দাদি আমারে খুব ভালো পাইত। আমি সাঁতার জানলে আমার দাদি মরত না।’

রাকিব মোহাম্মদপুরের ইউসেপ হিসাম উদ্দিন আহমেদ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তার ইচ্ছা, সে বড় হয়ে পুলিশ হবে। কারণ, তাদের অনেক ক্ষমতা। পিস্তল আছে। রাকিবের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বলে, ‘ছোডকালেই সবাইর সাঁতার শেখা উচিত, তাই না, আফা?’ উত্তরের আশা না করেই হনহন করে হেঁটে গিয়ে বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে দৃষ্টি ফেলে। হয়তো পানির ওপর রাকিবের ভীষণ অভিমান অথবা দাদির মুখখানা একবারের জন্য দেখার আপ্রাণ চেষ্টা।