জনগণকে বিভ্রান্তিতে রেখে গলফ খেলায় ব্যস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প

স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে ২৩ ডিসেম্বর মার লাগো রিসোর্টের উদ্দেশে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: এএফপি

মার্কিন জনগণকে বিভ্রান্তিতে রেখে ফ্লোরিডা রিসোর্টে গলফ খেলায় ব্যস্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক ক্রিসমাস উৎসব উদ্‌যাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। উৎসবের ছুটি পেরোলেই এক কোটি কর্মহীন লোকজনের ভাতা বন্ধ হয়ে পড়বে।

করোনা রিলিফ ও ফেডারেল সরকার পরিচালনার অর্থ বিল এখন ফ্লোরিডার মার লাগো রিসোর্টে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে বলেছেন না কী করবেন। তাঁর সহযোগীরাও এ নিয়ে কোনো নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না। ক্রিসমাসের দিন শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করেছেন। জনগণকে দুই হাজার ডলার করে নগদ প্রণোদনা দেওয়ার আরেক দফা আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

চার মাস আলোচনার পর উভয় দলের সমঝোতার প্রণোদনা প্যাকেজে কংগ্রেসে ও সিনেটে গৃহীত হয়। ৬০০ ডলারের পরিবর্তে জনগণের জন্য দুই হাজার ডলারের নগদ প্রণোদনা প্রস্তাব গত বৃহস্পতিবার প্রত্যাখ্যান করেছেন সিনেট রিপাবলিকানরা। তাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমঝোতার বিলেই অনুমোদন দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

সমঝোতার প্রণোদনা প্যাকেজের সঙ্গে কিছু দেশ ও সংস্থার জন্য অর্থ সাহায্যের খাত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ নিয়ে তাঁর আপত্তি জানিয়েছেন। জনগণের জন্য দুই হাজার ডলারের প্রস্তাব করে নতুন চাল দিয়েছেন তিনি। এ অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন করতে হলে বিদেশের জন্য সাহায্য এবং নানা সেবা খাত থেকে বরাদ্দ কর্তন করতে হবে।

ডেমোক্র্যাটদলীয় স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি আগামী সোমবার পৃথক আরেকটি আইনপ্রস্তাব কংগ্রেসে উপস্থাপন করবেন। জনগণের জন্য দুই হাজার ডলারের প্রস্তাব করে এ আইনপ্রস্তাবে রিপাবলিকানদের সমর্থন আশা করছেন ন্যান্সি পেলোসি।

রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা দলের প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবেন, না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন।

ফ্লোরিডার মার এ লাগো রিসোর্টের ফেডারেল সরকার পরিচালনার অর্থ বিল পাঠানো হয়েছে। এসব বিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষর না করলে আগামী মঙ্গলবার থেকে ফেডারেল সরকারের বহু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে বা থমকে দাঁড়াবে।

ফেডারেল সরকার পরিচালনার অর্থ বিল নিয়ে এমন অচলাবস্থা আগেও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমঝোতার জন্য প্রেসিডেন্টসহ আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটনে অবস্থান করেন। ছুটি বা অবকাশ বাদ দিয়েও জাতীয় জনগুরুত্ব বিষয়ে রাষ্ট্রনেতারা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন।

এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর কয়েক সপ্তাহ ক্ষমতায় আছেন। ২০ জানুয়ারি দুপুরে নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এখনো ফলাফল পাল্টে দেওয়ার কথাই বলছেন।

আগামী ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের যৌথ সভায় ইলেক্টোরাল ভোট অনুমোদন নিয়ে ট্রাম্পের সমর্থক কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আপত্তি উপস্থাপন করবেন। অতীতে সাংবিধানিক এসব প্রক্রিয়া নিয়ে বেশি মাতামাতি হয়নি কখনো। এবারে পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিচ্ছেন না। ভোট কারচুপির অভিযোগ নিয়ে তিনি আদালতেও কোনো পাত্তা পাননি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাড়িবহর
ছবি: এএফপি

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টও নির্বাচনের ফলাফলে কোনো হস্তক্ষেপ করা এড়িয়ে চলেছেন। এমন অবস্থায় ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতিবিধির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। যদিও কেউ মনে করছে না, ফলাফল পাল্টে দিয়ে আরেক দফা ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট রয়েছে।

জনগণের কাছে এ সপ্তাহটি বড় হয়ে উঠেছে নাগরিক প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য। ১ কোটি ৪০ লাখ লোকের বেকার ভাতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রণোদনা প্যাকেজে নগদ অর্থ দেওয়া ছাড়াও বেকার ভাতার মেয়াদ বর্ধিত করার প্রস্তাব রয়েছে।

সঙ্গে কর্মহীন মানুষের জন্য সপ্তাহে ৩০০ ডলারের অতিরিক্ত ভাতা দেওয়া হবে। এমন বর্ধিত ভাতা ১১ সপ্তাহের জন্য বর্ধিত করা হবে। প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে মোট মৃত মানুষের সংখ্যা এর মধ্যেই ৩ লাখ ৩০ হাজার ছুঁয়েছে।

নতুন প্রণোদনা প্যাকেজে ভাড়াটে ও বাড়ির মালিকদের জন্য সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার চরম এ দুঃসময়ে আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রণোদনা আইন পাস না হলে ভাড়াটেরা চরম বিপাকে পড়বেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু রাখার জন্য প্রণোদনাপ্রস্তাব দ্রুত আইনে পরিণত না হলে লাখো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়বে।

এমন অবস্থায় রাজনীতিবিদদের কুটচালে চরম বিরক্ত হয়ে উঠেছে আমেরিকার সাধারণ জনগণ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবকাশের দ্বিতীয় দিন ক্রিসমাসের সকালেও ফ্লোরিডার মার এ লাগো রিজোর্টে গলফ খেলেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ছিলেন গলফ খেলায় ট্রাম্পের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে নাগরিক প্রণোদনা বিল নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না, মার্কিন সংবাদমাধ্যম বলতে পারেনি।

গলফ খেলা থেকে ফিরে ফেসবুক ও টুইটারে দেওয়া পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি বেশ কিছু ফোন কল করা নয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এসব ফোন কল তাঁর নির্বাচনে জয় করার ভুয়া দাবি কি না, তাও জানাতে পারেনি কোনো সংবাদমাধ্যম। টুইট করে ট্রাম্প বলেছেন, জনগণকে দুই হাজার ডলার দেওয়ার বদলে রাজনীতিকেরা কেন ৬০০ ডলার দিতে চাইছেন, তার কারণ চীন। এটা রাজনীতিবিদদের দোষ না। এর জন্য দায়ী চীন।

ফেসবুক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, করোনাভাইরাসের জন্য জনগণ দায়ী নয় নয়, দায়ী চীন। জনগণকে দুই হাজার ডলার প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তিনি আইনপ্রণেতাদের প্রতি আরেক দফা আহ্বান জানিয়েছেন।