
ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা বোঝাতে বা নিজেদের ধর্মানুসারে পূজনীয় কাউকে বোঝাতে মালয়েশিয়ার অমুসলিমরা ‘আল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না। বিবিসি বলেছে, মালয়েশিয়ার এক আদালত আজ সোমবার এই আদেশ জারি করেছেন।
২০০৯ সালে দেশটির নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় বাতিল করে আজ উচ্চ আদালত এ রায় দিলেন।
আপিল আদালতের রায়ে বলা হয়, কেবল ইসলাম ধর্মের আলোচনাতেই আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত; নয়তো জনবিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
মালয়েশিয়ার সব ধর্মের লোকজনই ঈশ্বর বোঝাতে মালয় ভাষায় আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।
খ্রিষ্টানদের যুক্তি হলো, আল্লাহ শব্দটি আরবি থেকে মালয় ভাষায় এসেছে এবং গত কয়েক শতাব্দী ধরে ঈশ্বর বোঝাতে শব্দটি ব্যবহূত হয়ে আসছে। তাই শব্দটি কেবল আরবি বা ইসলামিক পরিভাষার সম্পদ নয়, বরং মালয় ভাষারও সম্পদ। এখন খ্রিষ্টানদের যদি শব্দটি ব্যবহার করতে দেওয়া না হয়, তবে তাতে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
এক মালয়েশীয় খ্রিষ্টান নারী জানান, আদালতের রায়ে তাঁর ধর্মের মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। দেশটির সাবহ প্রদেশ থেকে ইসতার মইজি নামের ওই নারী আরও বলেন, ‘যদি আল্লাহ শব্দটির ব্যবহার আমাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়, তবে তো পুরো বাইবেল আবার ভাষান্তর করতে হবে।’
হতাশা ও আতঙ্ক
২০০৯ সালে আদালতের রায়কে ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন গির্জা ও মসজিদে হামলার ঘটনাও ঘটে।
এর আগে সরকার এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল যে, ‘দ্য হেরাল্ড’ নামের ক্যাথলিক সংবাদপত্রটি তার মালয় ভাষার সংস্করণে খ্রিষ্টানদের ঈশ্বর বোঝাতে আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না।
প্রতিবাদে সরকারের প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে পত্রিকাটি মামলা করে। আদালত ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে পত্রিকাটির পক্ষে রায় দেন। সরকার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে।
আজ আদালতের প্রধান বিচারক মোহাম্মদ আপন্দি আলী সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ শব্দটি খ্রিষ্টধর্ম-বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। যদি তারা শব্দটি ব্যবহার করে, তাতে তাদের নিজেদের মধ্যেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে।’
‘দ্য হেরাল্ড’-এর সম্পাদক লরেন্স অ্যান্ড্রু বলেন, তিনি হতাশ ও আতঙ্কিত। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন তিনি। অ্যান্ড্রু বলেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মপালনের মৌলিক অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে এ ঘটনা আইনের উন্নতির বদলে অবনতিকেই নির্দেশ করে।’
পত্রিকাটির সমর্থকেরা বলছে, ১৯৬৩ সালে বর্তমান মালয়েশিয়া রাষ্ট্রের উদ্ভবের বহু শতাব্দী আগে থেকে মালয় ভাষার বাইবেলে ঈশ্বর বোঝাতে আল্লাহ শব্দটি ব্যবহূত হয়ে আসছে। অ্যান্ড্রু বলেন, ‘ঈশ্বর বোঝাতে আল্লাহ শব্দটি মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহূত হয়। ইন্দোনেশিয়ার খ্রিষ্টান ও মুসলমানরাও শব্দটি ব্যবহার করে। আপনি আজ হঠাত্ করে বলতে পারেন না যে, এটি আমাদের ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। আর সব ভাষার মতো মালয় ভাষাও অনেক বিদেশি শব্দ ধার করেছে। আল্লাহ শব্দটিও এ ধরনের ধার করা শব্দ।’
তবে কিছু মুসলিম গোষ্ঠী বলছে, খ্রিষ্টানরা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করলে অনেক মুসলমান খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে ফেলতে পারে। সরকারের পক্ষের আইনজীবী জয়নুল রিজাল আবু বকর বিবিসিকে বলেন, ‘আল্লাহ মালয় শব্দ নয়। যদি তারা (অমুসলমানরা) কোনো মালয় শব্দ ব্যবহার করতে চায়, তবে তারা আল্লাহর বদলে “তুহান” শব্দটি ব্যবহার করতে পারে।’
অনেক মালয়েশীর ধারণা, ক্ষমতাসীন মালয়-মুসলিম পার্টি ভোটারদের মন জয় করতে ইসলামি লেবাস ধারণ করতে উদগ্রীব। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের জোট সরকার গত মে মাসে ভোটে জয়লাভ করেছে। কিন্তু গত অর্ধশতকে তারাই দেশটির সবচেয়ে নাজুক জোট।
মালয়েশীয়দের দুই-তৃতীয়াংশই মুসলমান। তবে দেশটিতে বহু হিন্দু ও খ্রিষ্টানের বাস।