বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্মেলনের সূচনায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে না পারলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অর্জনে যেখানে প্রয়োজন ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস উদ্‌গিরণের পরিমাণ বর্তমানের অবস্থা থেকে ৪৫ শতাংশ কমানো, সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতি পালিত হলেও তা কমবে মাত্র ১২ শতাংশ। কপে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের উত্থাপিত হিসাবেই এই চিত্র উঠে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর জাতীয় পরিকল্পনা বা এনডিসি সিনথেসিস প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সালে ক্ষতিকর গ্যাসের উদ্‌গিরণ বাড়বে ২৬ শতাংশ। এতে উষ্ণায়ন বৃদ্ধির হার আর লক্ষ্যের ফারাক বেড়ে যাবে।

২০৩০ সালে ক্ষতিকর গ্যাসের উদ্‌গিরণ বাড়বে ২৬ শতাংশ। এতে উষ্ণায়ন বৃদ্ধির হার ও লক্ষ্যের ফারাক বেড়ে যাবে।

সম্ভবত এ কারণেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য এখন লাইফ সাপোর্টে। তবে আপসরফার সাম্প্রতিকতম খসড়া গৃহীত হলে গ্যাস উদ্‌গিরণ আরও বড় আকারে হ্রাস করার উপায় ও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়বে। এটি বাড়বে দুভাবে: প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় পরিকল্পনা বা এনডিসি দেওয়ার বদলে প্রতিশ্রুতি হালনাগাদ করতে হবে প্রতিবছর। আর প্রতিশ্রুতি পূরণে কী কী করা হয়েছে, তার বিবরণও প্রকাশ করতে হবে।

ক্ষতিকর গ্যাস উদ্‌গিরণ কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ হচ্ছে ঝুঁকি প্রশমনের (মিটিগেশন) অংশ। এই প্রশমন কাজে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণ ও নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করায় সহায়তার বিষয়টিই হচ্ছে ধনী দেশগুলোর অগ্রাধিকার। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে তাই প্রশমনের প্রশ্নটিই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে, যা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলার পদক্ষেপগুলো বা অভিযোজনে সহায়তার ক্ষেত্রে তাই শিল্পোন্নত দেশগুলোর রক্ষণশীল নীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো অযৌক্তিক বলেই দাবি করে এসেছে। ঘোষণাপত্রের নতুন খসড়া অনুমোদিত হলে অভিযোজনে সহায়তা দ্বিগুণ হবে।

অভিযোজনে সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত হলেও দীর্ঘকালীন অর্থায়ন এবং অতীতের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বিষয়ে অগ্রগতি সামান্যই। বার্ষিক ১০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পালনে শিল্পোন্নত দেশগুলো এখনো তাদের কোষাগারের অর্থ ছাড়তে প্রস্তুত নয়। এসব দেশ অর্থায়নে বেসরকারি খাত এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগকারীদের জোরদার অংশগ্রহণ চায়। এই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আপসরফার দলিল চূড়ান্ত হলে প্রতিশ্রুত ১০ হাজার কোটি ডলার নিয়ে আগামী বছরেও আলোচনা চলবে।

অভিযোজন ছাড়াও আরেকটি বড় বিরোধপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে গ্যাস নির্গমন, তার জন্য দায়ী দেশগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। অপূরণীয় ক্ষতি ও লোকসান নিয়ে অতীতে উন্নয়নশীল দেশগুলো আলোচনায় ছাড় দিলেও এবার তা বেশ জোরালোভাবে উঠে এসেছে। আশঙ্কা ছিল ধনী দেশগুলোর আপত্তির কারণে বিষয়টি হয়তো এবারও বাদ যাবে। কিন্তু নতুন খসড়ার প্রশ্নে সমঝোতা হলে আগামী বছরেই জাতিসংঘের অধীনে এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে।

যতটা প্রয়োজন বলে বৈজ্ঞানিক হিসাব ও ব্যাখ্যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোয়, ততটা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা এই খসড়া ঘোষণায় না থাকলেও আপসরফা হিসেবে অনেকেই একে স্বাগত জানিয়েছেন। আর সমালোচকেরা বলছেন, ঘোষণার খসড়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তের বদলে ‘আহ্বান’ ও ‘অনুরোধ’ শব্দের ব্যবহার খুব বেশি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে না। তবে এ রকম নমনীয় ঘোষণাপত্রও আরও নমনীয় হবে কি না, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষার পালা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিক, তরুণ, নারীদের বিভিন্ন অধিকার গোষ্ঠীর সম্মেলন কেন্দ্রের প্রতিবাদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে তাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁদের কথা শোনা হয়নি। কর্মকর্তারা দর-কষাকষি করেছেন আড়ালে এবং এটি নয়া-উপনিবেশবাদী কৌশল, যাতে বৃহৎ পুঁজির প্রভাব স্পষ্ট। তাঁরা জলবায়ুর ন্যায়বিচার (ক্লাইমেট জাস্টিস) দাবি করে স্লোগান দেন এবং রক্তের প্রতীক হিসেবে নিরাপত্তাবেষ্টনীতে লাল ফিতা বেঁধে দেন।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন