default-image

চীনের উহানে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। সেখান থেকেই মহামারি আকার ধারণ করে এই ভাইরাস এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে কেটে গেছে পাঁচ মাস। বসে নেই ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা। এই ভাইরাসকে প্রতিহত করতে গত পাঁচ মাসে সারা বিশ্বে প্রায় ৯০টি ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে। এসব ভ্যাকসিন নানা পর্যায়ে পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিশ্বে এই ভাইরাস ঠেকাতে নতুন নতুন ভ্যাকসিন তৈরির খবর আসছে। এসব ভ্যাকসিনের মধ্যে অন্তত ছয়টি ভ্যাকসিন পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য কাযর্কর বলেও খবর পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন ডেভেলপারস, অর্থায়নকারী ও অন্য অংশীদারেরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এই পাঁচ মাসে তৈরি হওয়া এত এত ভ্যাকসিনের মধ্যে কোন ভ্যাকসিনটা আসলে কার্যকর বা মানবদেহের জন্য কোন ভ্যাকসিনটি বেছে নেওয়া হবে—এটাই মূলত এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


নেচার ডটকমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ভ্যাকসিন বা প্লেসেবো তৈরিতে কয়েক হাজার মানুষ নানাভাবে জড়িত থাকেন। এই প্রক্রিয়া কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বিজ্ঞানীরা একের পর পরীক্ষা করতে থাকেন এই ভ্যাকসিনের প্রভাব। তবে এই মহামারির সময়ে বিজ্ঞানীরা দ্রুততার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাইরাসের বিরুদ্ধে কেবল ভ্যাকসিনই মানুষের শরীরে ইমিউনিটি বাড়িয়ে ভাইরাসকে প্রতিহত করতে পারে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।


গত এপ্রিল মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জেনেভায় জানিয়েছে, সংস্থাটি বেশ কিছু ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য পরিকল্পনা করছে। আবার বেশ কিছু ডেভেলপারস ও অর্থায়নকারীও নিজ উদ্যোগে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরিকল্পনা করছেন। তবে এসব ছাপিয়ে মূল যে প্রশ্ন এখন দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে কোন ভ্যাকসিনটি প্রথম পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে এবং কীভাবে ওই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা তুলনা ও পরিমাপ করা হবে?


নিউইয়র্কভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের (আইএভিআই) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী মার্ক ফিনবার্গ বলেন, করোনাভাইরাসের কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির জন্য সবার মধ্যে এমন স্তরের সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন, যা এর আগে কখনোই ঘটেনি। এ ছাড়া এমন সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি।


নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ইমিউনাইজেশনে অর্থায়ন করা সংস্থা দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স-গাভির প্রধান নির্বাহী সেথ বার্কলে বলেন, কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ২০০ ভ্যাকসিন নেওয়ার উপায় নেই।


ডব্লিউএইচওর প্রস্তাব হলো সবাই মিলে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের মূল কাযর্কারিতা যাচাই করা হবে। ধাপে ধাপে নিয়মিতভাবে ভ্যাকসিনের যাচাই করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের আগে তাদের ভ্যাকসিন পরীক্ষার জন্য তালিকাভূক্ত হতে হবে। যেসব ভ্যাকসিন কাজ করছে না বলে মনে হবে, সেসব ভ্যাকসিন সেখানেই বাতিল করে দেওয়া হবে।


এ বিষয়ে প্যারিসে ফ্রান্স ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চের রিসার্চ ডিরেক্টর মারি-পল কিইনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সবার আগে কীভাবে একটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হবে, তার বিশদ বিবরণ ও পরিকল্পনা করার দরকার রয়েছে ডব্লিউএইচওর। সামগ্রিক পদ্ধতির পরিকল্পনা করতে হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কিসের ভিত্তিতে কোন ভ্যাকসিনটি সবার আগে পরীক্ষা করা হবে, তা নির্বাচন করা।


মার্ক ফিনবার্গ বলেন, কিসের ভিত্তিতে কোন ভ্যাকসিনটি সবার আগে পরীক্ষা করা হবে, তা নির্বাচনে ডব্লিউএইচও একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল রেখেছে। এ ক্ষেত্রে কৌশলগত সমন্বয় খুবই জরুরি। তা না হলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এবং সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। তবে মনে হচ্ছে, ভ্যাকসিন পরীক্ষায় ডব্লিউএইচওর একক এই পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়।


করোনাভাইরাসের ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এপ্রিল মাসে দ্য ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) মেরিল্যান্ডে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বেথেসডাসহ ডজনখানেক কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। দ্য কোয়ালিশন অব এপিডেমিক প্রিপেয়ারডনেস (সিইপিআই) বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন তৈরিতে অর্থায়ন করে। এবারও নয়টি ভ্যাকসিন তৈরিতে সহায়তা করছে সংস্থাটি। সংস্থাটির ভ্যাকসিন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মেলানি সাভিলে বলেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাই, উৎপাদন ও অন্যান্য খরচসহ প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচের চিন্তা করছেন তাঁরা।


মারি-পল কিইনি বলেন, যেসব ভ্যাকসিন শুরুর দিকেই প্রাথমিক পরীক্ষায় মানুষ ও প্রাণীর দেহে ইমিউনিটি বাড়িয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে এবং যাদের উৎপাদন সক্ষমতা আছে, সেসব ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সামনের দিকে রাখতে হবে। এখনো কিছু ভ্যাকসিন আছে, যেসব মানবশরীরে পরীক্ষা করা হয়নি। সেসব নিচের দিকে রাখতে হবে।


এদিকে এক অনলাইন প্রেস ব্রিফিংয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চার অ্যান্ড্রিউ পোলার্ড বলেছেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনস্টিটিউটে একটি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আছে ভ্যাকসিনটি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ভ্যাকসিনটির চূড়ান্ত কার্যকারিতা যাচাই পরীক্ষায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে সামনে আরও একটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটা হলো এত এত ভ্যাকসিনের মধ্যে কীভাবে একটি থেকে আরেকটি তুলনা করা হবে। ডব্লিউএইচওর প্রস্তাব অনুযায়ী, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি একটি থেকে আরেকটির তুলনা করা যাবে। কিন্তু মারি-পল কিইনির ধারণা, ডব্লিউএইচওর এই প্রস্তাব অনেকেই মানতে চাইবে না। কারণ এতে ওই ডেভেলপার বা সংস্থা বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে সামনে এই চ্যালেঞ্জটা চলে আসছে।


আইএভিআইর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস অ্যান্ড সায়েন্টিফিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান স্বাতী গুপ্ত বলেন, ডেভেলপাররা নিশ্চয়ই বোঝার চেষ্টা করবেন ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাইয়ের আগে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির তুলনা করা হবে। পরীক্ষার আগেই তাঁদের নিশ্চিত করতে হবে যে তাঁদের ভ্যাকসিনগুলো কার্যকারিতা যাচাইয়ে সক্ষম।


লন্ডনের ওয়েলকাম ট্রাস্ট বায়োমেডিকেল চ্যারিটির ভ্যাকসিন প্রধান শার্লি ওয়েলার বলেন, একটি থেকে আরেকটি ভ্যাকসিনের তুলনামূলক যাচাইটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ডেভেলপাররা মূলত বাণিজ্যিক মডেল সামনে রেখে ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করেন। বর্তমানে বিশ্বে যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে এমন মডেল কাজ করবে না।


মারি-পল কিইনি বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের যে চাহিদা, তা ডেভেলপারদের আরও বেশি আন্তরিক ও আগ্রহী করে তুলতে সহায়তা করতে পারে। আসলে আমাদের একাধিক ভ্যাকসিন দরকার। কারণ একচেটিয়া ব্যাপারটা সব সময়ই খারাপ। এ ছাড়া নির্দিষ্ট করা ভ্যাকসিনটির পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা না–ও থাকতে পারে।


করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা বলছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। তবে কিছু কিছু ডেভেলপার বিকল্প উপায়ে তাঁদের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাই করে দেখছেন।


শুরুতে ভ্যাকসিন কয়েক শ মানুষের শরীরে দিয়ে এর কার্যকারিতা যাচাই করে দেখা হয়। এতে পজিটিভ ফল পাওয়া গেলে ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভাইরাসে সংক্রমিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর জরুরি ভিত্তিতে তা প্রয়োগের অনুমতি নিতে হয়। ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতো ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা জরুরি প্রয়োজনে প্রয়োগের অনুমতি দিতে পারে।


চীনের তিয়ানজিনে কানসিনো বায়োলজিকস কোম্পানির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁদের কোম্পানি এ ধরনের একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। জরুরি প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করা যাবে। আবার জনসন অ্যান্ড জনসন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০২১ সালের শুরুর দিকে তাদের তৈরি ভ্যাকসিন জরুরি প্রয়োজনের প্রয়োগ করার সক্ষমতা অর্জন করবে।


তবে ডব্লিউএইচওর ইমিউনাইজেশনস, ভ্যাকসিনস অ্যান্ড বায়োলজিক্যালস ডিপার্টমেন্টের প্রধান ক্যাথেরিন ও'ব্রিয়েন বলেন, এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে কোনো ভ্যাকসিনের প্রয়োগ করা হয়নি। যদি কোনো ভ্যাকসিন সঠিক পথে তৈরি হয়ে থাকে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করে যে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ, তাহলেই কেবল তা প্রয়োগ করা হবে। কারণ নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0