বিজ্ঞাপন

ভবন ধ্বংসের চিত্র

১০ মে থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটির হামাস সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত হামলায় গাজার ছয়টি আইকনিক বহুতল ভবন ধ্বংস হয়েছে। ওই ভবনগুলোসহ ১৮৪টির বেশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এসব ভবনের কয়েকটিতে ৩৩টি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল।

গত শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যায় আল-জালা টাওয়ার। ভবনটিতে ছিল কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা, বার্তা সংস্থা এপির কার্যালয়। বেশ কিছু আবাসিক ফ্ল্যাটও ছিল সেখানে। গাজার ভবনে হামলা চালানোর পেছনে ইসরায়েলের ভাষ্য হচ্ছে, সেগুলো ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা হাজির করতে পারেনি। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী বোমা হামলার খবর প্রকাশকারী সাংবাদিকদের ‘চুপ করিয়ে’ দিতেই ভয়ানক এই আঘাত বলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিমত।

হামাসকে নিবৃত করতে হামলা চালানো হচ্ছে বলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এবারই এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে বেসামরিক এলাকায়। টানা ১১ দিন হামলার পর গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল। ১০ মে থেকে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ২৩২ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫ জন শিশু। আহত হয়েছে ১ হাজার ৯০০ জন। জাতিসংঘ বলছে, অন্তত ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি গৃহহীন হয়েছে। গাজায় সংস্থাটির পরিচালিত ৫৮টি স্কুলে আশ্রয় নিচ্ছে এসব মানুষ। তবে হামাস বলছে, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার।

default-image

গাজার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েলি হামলার কারণে অধিকৃত এই উপত্যকার লাখ লাখ মানুষ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা সমস্যায় পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলোর একটি গাজা। মাত্র ২৫ মাইল দৈর্ঘ্য এবং ৩ দশমিক ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাইল প্রস্থের এই অঞ্চলে ২০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস।

ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান থেকে গাজার হাসপাতাল–সংলগ্ন সড়ক ও এলাকাগুলোয় বোমা ফেলা হয়। তাতে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি পরিষেবার গাড়িগুলো চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। টেলিযোগাযোগ লাইন, বৈদ্যুতিক গ্রিড, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানির লাইনও বিমান হামলার শিকার হয়।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এবার ইসরায়েলের ১১ দিনের হামলায় যে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার অর্থমূল্য ৩২ কোটি ২৩ লাখ ডলারের বেশি।

বেসামরিকদের ওপর হামলা নতুন নয়

রাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞ মোহসেন আবু রমাদান বলেছেন, গাজার বেসামরিক এলাকা ও অবকাঠামোয় বোমা নিক্ষেপের ইসরায়েলি কৌশল নতুন কিছু নয়।

আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘গাজায় ইসরায়েলের আগের অভিযানগুলোতেও এটা আমরা দেখেছি। তবে এবার বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার মাত্রা ছিল অনেক বেশি।’ তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন এবং আরব নেতাদের ‘অদক্ষতার’ কারণেই ইসরায়েল এটা করতে পারছে।

ইসরায়েলের ১১ দিনের হামলার মধ্যে গত রোববার এক দিনেই সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হন। এদিন মারা যান ৪২ জন, যাঁদের মধ্যে ১০টি শিশু এবং ১৬ জন নারী। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় তাঁদের ঘর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিলেন পরিবারগুলোর সদস্যরা। গাজা শহরের একেবারে কেন্দ্রে আল-ওয়েহদা সড়কে জনবহুল এলাকায় এই হামলা চালানো হয়।

আবু রমাদান জানান, হামলার আগে মানুষ যাতে ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, সেই সতর্কতাও দেয়নি ইসরায়েল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটছে। হামলা চালানোর আগে মানবিকতার জায়গা থেকে সতর্ক করা হচ্ছে বলে ইসরায়েলি প্রচারণা ছিল ফালতু কথা।

লক্ষ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলা?

বোমা হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির কথা স্বীকার করে ইসরায়েল সেনাবাহিনী বলেছে, ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুঃখজনক’ এ ঘটনা ঘটেছে। তবে আল-ওয়েহদা সড়কের মতো হামলার বিষয়ে আবু রমাদান বলছেন, এসব হামলার পেছনে উদ্দেশ্য থাকতে পারে—হামাসসহ গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলা।

এ বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘বিপুল বেসামরিক লোক হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলা করা হয়েছে মূলত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভাবমূর্তি নষ্ট করতে। তাঁদের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরানোই এ ধরনের হামলার লক্ষ্য। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রকেট হামলা বন্ধের দাবি ওঠাতে চায়। এটিকেই পুঁজি করতে চাইছে ইসরায়েল।’

তবে গাজা পৌরসভার মেয়র ইয়াহিয়া আল-সারাজ বলেন, ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুল বেসামরিক লোক হত্যার মাধ্যমে আমাদের অবিচল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।’
ইয়াহিয়া আল-সারাজ বলেন, ‘আমি যখন মানুষের সঙ্গে দেখা করি, বিশেষ করে যাঁরা স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সংকল্পই দেখতে পেয়েছি। কারণ, তাঁরা জানেন, গাজায় এ হামলা নিছক কোনো যুদ্ধ নয়, এটি পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমের মতো ইসরায়েলি দখলদারি সম্প্রসারণের নীতি।’

default-image

সমুদ্রঘেঁষা ক্যাফে, কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য কেন্দ্র ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও রেহাই পায়নি ইসরায়েলের বিমান হামলা থেকে। আল সারাজ বলেন, ম্যাট্রেস ও আইসক্রিম কারখানার মতো প্রতিষ্ঠানে হামলার অর্থ দাঁড়ায় গাজার অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়া। তাঁর মতে, পরিকল্পনা করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে, তাদের অসহায় করে দেওয়াই ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য। তরুণেরা যখন কাজ হারায় বা দেখে, হামলায় তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো চোখের সামনে উধাও হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়।’

হামলার দৃশ্য ইসরায়েলিদের ‘চাঙা করে’

ফিলিস্তিনে বহুতল ভবনে হামলার পেছনে আরেকটি কারণের কথা বলেছেন ইসরায়েলের দৈনিক পত্রিকা হারেৎজের কলাম লেখক গিডেওন লেভি। তাঁর মতে, টেলিভিশনে দর্শনীয় করে তোলার জন্য বহুতল ভবনে হামলা চালানো হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েলে হামলার পক্ষে জনমত চাঙা হয়।

আল–জাজিরাকে লেভি বলেন, টাওয়ারগুলোতে যখন বোমা ফেলা হয়, সেটা বড় করে দেখা যায়। সেই দৃশ্যই ইসরায়েলি টিভি চ্যানেলগুলোতে বারবার দেখানো হয়। টাওয়ারগুলো যখন ভেঙে পড়ে, ‘দুর্দান্ত দৃশ্য’ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে নিজেদের নাগরিকদের বোঝানো হয়, ইসরায়েল কত শক্তিশালী এবং ইসরায়েলি পাইলটেরা কত সুনিপুণভাবে এক বা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গোটা টাওয়ার ধ্বংস করে দিচ্ছে।
তবে দেখানোর জন্য এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ইসরায়েলের দুর্বলতার লক্ষণই মনে করেন এ লেখক। তিনি বলেন, ইসরায়েল সব সময় এটি করতে গর্ববোধ করে যে, তারা নির্দিষ্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট একটি ফ্লোরের নির্দিষ্ট একটি কক্ষকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালাতে পারে। ইসরায়েল এটা করে কারণ, সে এটা পারে এবং কেউ তাকে এটা করা থেকে থামাতে পারে না।

গিডেওন লেভি বলেন, গাজায় কী ঘটছে, সে সম্পর্কে অল্পই জানে ইসরায়েলিরা। ফিলিস্তিন ভূখণ্ড সম্পর্ক কিছু না জানতে পেরেই খুশি তাঁরা। তিনি বলেন, ‘গাজা নিয়ে যেসব প্রতিবেদন ও ছবি তারা দেখে, তাতে দুরবস্থার চিত্র থাকে না।’

ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠছে গাজা

গাজায় দাঁড়িয়ে আল-সারাজ বলেন, ফিলিস্তিনিদের সংকল্প বরাবরের মতো দৃঢ়। সংকট উত্তরণে সব সময় সৃজনশীল পন্থা বের করার চেষ্টায় থাকে তরুণেরা। বিষয়টিকে তিনি ফিনিক্স পাখির সঙ্গে তুলনা করেন। ছাই থেকে পুনরায় জেগে উঠেছিল গ্রিক পুরাণের এ পাখি, আরও বেশি শক্তি নিয়ে। গাজা পৌরসভার এ মেয়র বলেন, ‘গাজা এর মধ্যেই ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবনের পথে ফিরতে শুরু করেছে।’

আলদ্রাইমলির কাছে ইসরায়েলের প্রতিটি হামলা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আরও বেশি ঐক্য গড়ে তোলে। তিনি বলেন, আমার ৭৬ বছর বয়সী বাবা ১২ মে নিহত হয়েছেন, সে সময় তিনি নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন। এখন আমি আমার প্রতিষ্ঠান হারিয়েছি। এগুলো আমার জন্য বড় আঘাত। কিন্তু এটিই আমাদের ঐক্যবদ্ধ রাখে, আমাদের আরও শক্তি জোগায়, যা পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বিশেষ করে জেরুজালেমে আমরা ছড়িয়ে দিতে পারি।’

আলদ্রাইমি ইতিমধ্যে কাজে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘ভবন ধ্বংস হওয়ার প্রথম দিন থেকেই অনেক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান তাঁদের অফিস আমাদের ছেড়ে দিতে চেয়েছেন, যাতে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারি। এটা অনেক উৎসাহব্যঞ্জক এবং এটিই প্রমাণ করে, ইসরায়েলিরা আমাদের স্মৃতিগুলো কখনো মুছে দিতে পারবে না।’

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন