বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুধু ডেলটা নয়, করোনার এই ধরনটি রূপ বদলে আরও শক্তিশালী হয়েছে যুক্তরাজ্যে। দেশটিতে ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে করোনার ডেলটা প্লাস ধরন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেলটার তুলনায় ডেলটা প্লাস ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি সংক্রামক। তবে এগুলো নিয়ে এখনও যথেষ্ট তথ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে নেই। করোনার এসব নতুন ধরনকে ডেলটা ধরনের ‘নাতি–পুতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন উইলিয়াম হানাগি।

তবে উইলিয়াম হানাগি ও তাঁর সহকর্মীদের প্রতি সপ্তাহে বৈঠকে বসার উদ্দেশ্য হলো, এই ভাইরাসের ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে পূর্বানুমান করা। ডেলটাই কি করোনার সর্বশেষ অতিসংক্রামক ধরন? নাকি এর পর আরও নতুন কিছু সামনে আসবে? বিশ্ববাসী করোনার আরও ভয়াবহ কোনো ধরন প্রত্যক্ষ করবে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন উইলিয়াম হানাগিসহ মহামারি বিশেষজ্ঞরা।

এখানে প্রশ্ন অনেক। কিন্তু এসব প্রশ্নের যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর এখন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা দিতে পারেননি। তবে তাঁরা বলছেন, করোনার আলফা ধরন যত দ্রুত রূপ বদলেছে, জিনগত রূপান্তর ঘটিয়েছে, ডেলটার রূপ বদলানোর গতি সেই তুলনায় বেশ ধীর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার টিকা দেওয়ার হার বাড়ছে। এটা একটা কারণ। তবে ডেলটার আরও শক্তিশালী ধরন এখনকার টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। যদিও এজন্য অনেক সময় লাগবে। তবে এসব বিশেষজ্ঞদের পূর্বানুমান মাত্র।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো ও এর নতুন রূপ তৈরির সুযোগ সীমিত করে আনতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ চালু রাখা যেতে পারে।
রবি গুপ্তা, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক

ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের (ইউসিএল) জেনেটিকস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফ্রাঙ্কোইস বলৌক্স বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা করোনাভাইরাসের যেসব রূপবদল দেখতে পাব, সেগুলো মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসের ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তনে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতে দেখা গেছে।’

কিন্তু হঠাৎ করে ভাইরাসের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হওয়া এবং সেটির অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা অর্জন করা উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়, এমনটা বলেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক রবি গুপ্তা। তিনি বলেন, ভাইরাসের এমন ধরনকে ‘সুপারভেরিয়েন্ট’ বলা যায়। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রবি গুপ্তার মত, ‘ভবিষ্যতে আমরা করোনার আরও একটি সুপার ধরন দেখতে পাব। এখন প্রশ্ন হলো, সেটি কবে?’

এ বিষয়ে রবি গুপ্তা বলেন, এখন করোনার ডেলটা মহামারি দেখা যাচ্ছে। এই ধরনটির প্রধানত দুটি রূপ (ডেলটা ও ডেলটা প্লাস) বেশি ভোগাচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে করোনার নতুন আরেকটি ধরন বিশ্ববাসীর সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। সংক্রমণের দিকে থেকে এটির ডেলটাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘সুপারভেরিয়েন্ট’–এর দেখা মিলবে কবে

২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই–ডিসেম্বর) মহামারি বিশেষজ্ঞেরা বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের জিনগত রূপান্তরের উদ্বেগজনক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। জিনগত রূপান্তরের জের ধরে ধীরে ধীরে রূপবদল করার মধ্য দিয়ে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সম্পূর্ণ নতুন ধরনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। রবি গুপ্তার মতে, করোনার এখনকার রূপবদল খুব সাধারণ বলা যাবে না। বরং এটি নতুন একটি সুপারভেরিয়েন্টের উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত বিশ্বের সেসব জায়গায়, যেখানে টিকা গ্রহণের হার তুলনামূলক কম। সেসব জায়গায় এটির সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে।

ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের আরও বড় ধরন দেখা দেওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। একসঙ্গে অনেক জায়গায় ভাইরাসটির জিনগত রূপান্তর হতে পারে।
গিদেয়ন সেরেইবার, ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের জৈব-আণবিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক

আরেকটি বিষয় হলো, আগামীতে করোনাভাইরাসের বড় ধরনের জিনগত রূপান্তর হলে সেটা এখনকার ডেলটা ধরনের আরও উন্নত বা শক্তিশালী একটি রূপ হতে পারে। কিংবা সম্পূর্ণ নতুন একটি ধরনের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের জৈব-আণবিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক গিদেয়ন সেরেইবার বলেন, যদিও এখনকার রূপগুলো ডেলটার সংস্করণ, তবে ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের আরও বড় ধরনের রূপান্তরের জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। একসঙ্গে অনেক জায়গায় ভাইরাসটির জিনগত রূপান্তর হতে পারে। এটা আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার বড়ি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বড়ি ব্যবহার করার অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পরে বাংলাদেশও এই ওষুধ সেবনের অনুমোদন দিয়েছে। ‘মলনুপিরাভির’ নামের ওষুধটি করোনায় সংক্রমিত রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি অর্ধেক কমিয়ে দেয় বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মার্ক প্রথম মলনুপিরাভিরের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা চালায়। শিগগিরই করোনার ওষুধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি ভিত্তিতে এটি ব্যবহারের জন্য সে দেশের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছে আবেদন করবে প্রতিষ্ঠানটি। মার্ক–এর মতে, এই বড়ি মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের বিস্তারের সক্ষমতা হ্রাস করবে।

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার বড়ি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বড়ি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশেও ওষুধটি সেবনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ‘মলনুপিরাভির’ নামের এই ওষুধ করোনায় সংক্রমিত রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি অর্ধেক কমিয়ে দেয় বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই বড়ি অ্যান্টি-ভাইরাল বা ভাইরাসপ্রতিরোধী হওয়ায় তা শরীরে করোনাভাইরাসের প্রতিরূপ সৃষ্টি ব্যাহত করে। ভাইরাসটি যতক্ষণ পর্যন্ত পুনরুৎপাদনের সক্ষমতা না হারায় ততক্ষণ মিউটেশনের মাধ্যমে সেটির জিনগত পরিবর্তন ঘটায়। কোনো কোনো ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বলছেন, এসব ভাইরাল মিউট্যান্টের কোনোটি যদি টিকে যায় এবং অন্যদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা নতুন ধরন তৈরি করতে পারে।

রবি গুপ্তার মতে, এটা ভয়াবহ একটি বিপদের আশঙ্কা তৈরি করছে, যা করোনার নতুন একটি সুপার ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সম্পূর্ণ নতুন এই ধরন আগেরগুলোর চেয়ে আরও বেশি সংক্রামক হতে পারে। এর ফলে করোনা প্রতিরোধে প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

সুপারভেরিয়েন্ট ও টিকা

করোনার নতুন সুপারভেরিয়েন্ট কেমন হতে পারে, সেই সম্পর্কে এখনও জানা ও বোঝার চেষ্টা করছেন মহামারি বিশেষজ্ঞরা। ভাইরাসের প্রধান রূপান্তরগুলো এর সংক্রমণ সক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছে। এই কারণে করোনার অন্যান্য ধরনের তুলনায় ডেলটায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। প্রথম দিকের করোনা সংক্রমণের তুলনায় দুই থেকে তিন দিন আগেই এই ধরনে লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে থাকে।

তবে আশার কথা হলো, করোনার এমন রূপান্তরের বিষয়টি মাথায় রেখেই টিকা তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কোনোভাবেই চাইবেন না করোনার এমন কোনো সুপারভেরিয়েন্ট সামনে আসুক, যেটা টিকার কার্যকারিতা পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে। মহামারি নিয়ন্ত্রণে গত দুই বছরের অর্জন ম্লান করে দেবে।

default-image

ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় প্রজন্মের টিকা উদ্ভাবন হয়েছে। টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নোভাভ্যাক্স কয়েক মাসের মধ্যে এই টিকার অনুমোদনের আশা করছে। ২০২৩ সালের মধ্যে এমন অনেক টিকা বাজারে আসবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ আগামী দিনগুলোয় করোনার সুপারভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে বিশ্ববাসীকে আশার পথ দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিটস্টোনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট কারিন জোস জানান, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় প্রজন্মের টিকার প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছে। এই টিকা ভাইরাসটির প্রচলিত সব ধরনের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকার ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না।

এ বিষয়ে রবি গুপ্তা বলেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো ও এর নতুন রূপান্তরের সুযোগ সীমিত করে আনতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ চালু রাখা যেতে পারে।

বর্তমানে ইউরোপে করোনা শনাক্তের হার আবারও বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। এর পেছনে ভূমিকা রয়েছে ডেলটা ধরনের। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা জরুরি। তাই জনাকীর্ণ জায়গাগুলোয় মাস্ক না পরে চলাফেরা এড়িয়ে চলতে হবে। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্য, ভারত, ব্রাজিলের মতো জনবহুল ও করোনা নিয়ে তুলনামূলক কম সচেতনতা দেখিয়েছে, এমন দেশগুলোয় করোনার নতুন ও অতিসংক্রামক ধরন দেখা গেছে। সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কিন্তু নতুন ধরন ছড়ায়নি। এর কারণটা বুঝতে হবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম ইমন

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন