সু চির দলের জেতার সম্ভাবনাই বেশি। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে নীতিগত পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা নেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

সামরিক শাসনের অবসানের পর মিয়ানমারে আজ রোববার দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব-নিকাশে বলা হচ্ছে, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বহাল থাকছে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বড় ধরনের কোনো নীতিগত পরিবর্তনের তেমন সম্ভাবনা নেই।

কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা যেহেতু নেই, সেহেতু বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রক্রিয়ার ওপরই জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। শুধু প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করে ফলাফল আসবে না।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আর মিয়ানমারের নির্বাচনের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা থমকে আছে। আশা করছি, সে দেশে নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আবার আলোচনা শুরু হবে।’

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত প্রধান বিষয় রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় কোনো উদ্যোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে একমাত্র সীমান্ত ইস্যুতেই নিয়মিত বৈঠক হয়।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (এসআইপিজি) জ্যেষ্ঠ ফেলো মো. শহীদুল হক গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারে নির্বাচনের পর সু চি এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে এদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।

মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইয়াঙ্গুন থেকে মান্দালয় পর্যন্ত পুরো অঞ্চলজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বামারদের আধিপত্যের ওপর ভর করে অন্তত ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে যাবে সু চির দল। জনতার মধ্যে প্রধান বিরোধী দল সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) অবস্থান ততটা শক্তিশালী নয়।

মিয়ানমারে নির্বাচনের পর সু চি এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে এদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।
মো. শহীদুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

অবশ্য বিশ্লেষকেরা এ-ও বলছেন, এনএলডি হয়তো আবার সরকার গঠন করবে, তবে তারা ২০১৫ সালের মতো তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-ও পেতে পারে। কারণ, দেশটির রাখাইন, কাচিন, কারেন, মন, শান ও শিন রাজ্যের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীভিত্তিক দলগুলো গণতন্ত্রের যে স্বপ্ন নিয়ে সু চির ওপর ভরসা করেছিল, গত পাঁচ বছরে তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে।

যেমন মিয়ানমারের পার্লামেন্টে রাখাইনের জন্য মোট ২৯টি আসন বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চকক্ষে ১২টি ও নিম্নকক্ষের ১৭টি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এসব আসনের মধ্যে উচ্চকক্ষের ৭টি এবং নিম্নকক্ষের ৯টিতে সু চির দল এনএলডি হেরেছিল। সহিংসতার আশঙ্কার কারণ দেখিয়ে এবারের নির্বাচনে ওই ১৬টি আসনে ভোট হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

২০১৫ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্নকক্ষ মিলিয়ে ৪০টি আসনে জিতে তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল রাখাইনদের দল আরাকান ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি)। রাখাইন রাজ্যে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে দলটি রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারেনি। করেছিল এনএলডি। কারণ, মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী কোন দল রাজ্য সরকার গঠন করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্টের। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট গতবার এনএলডিকে দিয়ে রাখাইনে রাজ্য সরকার গঠন করান।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, এবার বেশ কিছু আসনে নির্বাচন না হওয়ায় রাখাইনে এনএলডি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ বেড়েছে। ফলে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ন্যূনতম কোনো সমবেদনা নেই। আইসিজে ও আইসিসির পদক্ষেপই তাদের কিছুটা চাপে ফেলেছে। কাজেই আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমারকে খুব একটা নাড়ানো যাবে না।

মন্তব্য পড়ুন 0