বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হ্যালোইন উৎসবে যাঁরা মেতে ওঠেন, তাঁদের ঠিক ধারণা নেই এ উৎসবের উৎস সম্পর্কে। গল্পনির্ভর এ উৎসব পশ্চিমা সমাজে অনেক পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবর্তন ঘটেছে। জানা তথ্য মতে, হ্যালোইন শব্দের উৎপত্তি ১৭৪৫ সালের দিকে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে এর উৎপত্তি। এর বাংলা অর্থ হলো পবিত্র বিকেল বা রাত। এটি স্কটিশ শব্দ, যার মানে হলো ‘সবকিছু পবিত্র’ বা ‘অল হ্যালোস’থেকে এসেছে, যা পবিত্র বিকেল বা রাতের পূর্ববর্তী দিবসকে বোঝাত।

আধুনিক হ্যালোইন ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেল্ট ভাষাভাষী দেশের অধিবাসীদের লোকাচার ও বিশ্বাসে প্রভাবিত ধর্মাশ্রয়ী সামাজিক সংস্কৃতি। ঐতিহাসিক নিকোলাস রজার্স হ্যালোইনের উৎপত্তি খুঁজতে গিয়ে বলেন, রোমানদের প্রাচুর্যময় ফলের দেবী পোমানার সম্মানে ভোজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হ্যালোইন। এ প্রসঙ্গে নানা ধরনের পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। তবে আধুনিক হ্যালোইন লোকাচারে খ্রিষ্টীয় ধর্ম মতবাদের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। ৩১ অক্টোবর এবং ১ ও ২ নভেম্বরে ইউরোপ-আমেরিকার অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী হ্যালোইন উৎসব পালন করেন।

default-image

হ্যালোইন আমেরিকায় কীভাবে আসে

ব্রিটিশশাসিত আয়ারল্যান্ডে হ্যালোইন শুরু হওয়ার পর কট্টর প্রোটেস্ট্যান্ট বিশ্বাসের কারণে ঔপনিবেশিক ইংল্যান্ডে হ্যালোইন উদ্‌যাপন খুবই সীমিত ছিল। মেরিল্যান্ড এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় উপনিবেশে হ্যালোইন খুবই সাধারণ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমেরিকায়ও শুরু হয় এই উৎসব। বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতিগত গোষ্ঠী, আমেরিকান ভারতীয়দের বিশ্বাস এবং রীতিনীতিগুলো মিশে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হ্যালোইন একটি স্বতন্ত্র আমেরিকান সংস্করণে আবির্ভূত হতে শুরু করে। প্রথম উদ্‌যাপন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো, সেখানে ফসল কাটা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এসব অনুষ্ঠানে প্রতিবেশীরা নিজের ভাগ্য নিয়ে কথা বলতেন, নাচতেন ও গান করতেন।

ঔপনিবেশিক যুগে হ্যালোইন উৎসবে ভূতের গল্প বলা এবং বিভিন্ন ধরনের দুষ্টুমি করা হতো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি, সবাই বার্ষিক শরৎ উত্সব পালন করা হতো। কিন্তু তখনো আমেরিকায় হ্যালোইন উদ্‌যাপন শুরু হয়নি। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, আমেরিকায় নতুন অভিবাসীদের জোয়ার শুরু হয়। এসব নতুন অভিবাসীর মধ্যে লাখো আইরিশ দুর্ভিক্ষের কারণে পালিয়ে আসে। ধীরে ধীরে জাতীয়ভাবে হ্যালোইন উদ্‌যাপনকে জনপ্রিয় করতে তারাই সাহায্য করে।

উদ্‌যাপনের ইতিহাস ও ধরন

ইউরোপের ধার করা এসব ঐতিহ্য থেকে আমেরিকানরাও ওই রকম পোশাক পরতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার কিংবা অর্থ চাইতে শুরু করেন, সেই অভ্যাসটি অবশেষে আজকের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আমেরিকান তরুণীরা বিশ্বাস করতেন যে হ্যালোইনে তাঁরা কাপড় বুনে, বিশেষ উপায়ে আপেল কেটে বা আয়না দিয়ে কৌশল করে তাঁদের ভবিষ্যৎ স্বামীর নাম বা চেহারা দেখতে পারেন।

১৮০০ দশকের শেষের দিকে আমেরিকায় হ্যালোইন ছুটির দিনে পরিণত হয়। শতাব্দীর শুরুতেই শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য হ্যালোইনের দিনটি উদ্‌যাপনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন পার্টিতে খেলাধুলা, মৌসুমি খাবার এবং উত্সবমুখর পোশাকে জোরা দেওয়া শুরু হয়।

default-image

হ্যালোইন পার্টি

১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে হ্যালোইন একটি ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু সম্প্রদায়কেন্দ্রিক ছুটিতে পরিণত হয়েছিল। দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো এবং শহরব্যাপী হ্যালোইন পার্টিগুলো অনেকটা বিনোদনে রূপ নেয়। এ সময় অনেক স্কুল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক সম্প্রদায়ের কিছু কিছু উদ্‌যাপনে ভাঙচুর শুরু হয়।
আর এই পরিস্থিতি অনেককেই ভাবিয়ে তুলছিল। অবশেষে ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে শহরের নেতারা ভাঙচুরের ঘটনা কমিয়ে আনতে সমর্থ হন। এরপরে হ্যালোইন একটি ছুটিতে পরিণত হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকে অল্প বয়সী শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পার্টিগুলো শহরের নাগরিক কেন্দ্রগুলো থেকে শ্রেণিকক্ষ কিংবা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, যেখানে তাদের আরও সহজে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

১৯২০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে হ্যালোইন উদ্‌যাপনে শতবর্ষী অনুশীলন পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। গোটা সম্প্রদায়ের জন্য হ্যালোইন উদ্‌যাপন ভাগাভাগি করতে পুরোনো কৌশলটি তুলনামূলকভাবে সস্তা উপায় ছিল। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, পরিবারগুলো প্রতিবেশী শিশুদেরকে অল্প পরিমাণ খাবার দিয়েই তাদের ওপর চালানো কৌশলগুলো ঠেকাতে পারে।

এভাবে একটি নতুন আমেরিকান ঐতিহ্যের জন্ম হয়, যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বর্তমানে আমেরিকানরা হ্যালোইন উৎসবে বার্ষিক আনুমানিক ৬০০ কোটি ডলার খরচ করে। বড়দিনের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক ছুটিতে পরিণত হয়েছে।

আত্মাদের দিন এবং ‘সোল কেক’

আমেরিকায় ট্রিক কিংবা ট্রিটিংয়ের হ্যালোইন ঐতিহ্য সম্ভবত ইংল্যান্ডের প্রথম দিকের ‘অল সোলস ডে প্যারেডের’ সময়কার। এর মানে হলো উত্সব চলার সময়ে, দরিদ্র নাগরিকেরা খাবার ভিক্ষা চাইবে এবং সচ্ছলেরা তাঁদের পরিবারের না ফেরার দেশে যাওয়া স্বজনদের জন্য প্রার্থনা করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তাঁদের ‘সোল কেক’ বা আত্মার কেক নামক পেস্ট্রি দেবেন।

ঘুরে বেড়ানো আত্মাদের জন্য খাদ্য ও ওয়াইন ত্যাগের প্রাচীন অভ্যাসের মাধ্যমে গির্জাগুলো ‘সোল কেক’ বিতরণে উত্সাহিত করেছিল। এই চর্চাকে ‘আত্মা-প্রাণে যাওয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত শিশুদের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এসব শিশু তাদের প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো ঘুরে বেড়ায় আর তাদের বিশেষ পানীয়, খাবার এবং অর্থ দেওয়া হয়।

হ্যালোইনের পোশাক পরার ঐতিহ্যের মধ্যে ইউরোপীয় ও সেল্টিক শিকড় রয়েছে। শত শত বছর আগে, শীতকাল ছিল একটি অনিশ্চিত এবং ভয়ংকর সময়। ওই সময়ে খাদ্য সরবরাহ অনেকটা কম ছিল এবং অনেক মানুষই খারাপ সময়ের আশঙ্কা করছিল। অন্যদিকে শীতকালের সংক্ষিপ্ত দিনগুলো দুশ্চিন্তায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হ্যালোইন সব সময় রহস্য, জাদু এবং কুসংস্কারে ভরা একটি ছুটির দিন হয়েছে। এটি গ্রীষ্মের শেষের সেল্টিক উত্সব হিসেবে শুরু হয়েছিল, যে সময় লোকজন তাঁদের মৃত আত্মীয় এবং বন্ধুদের কাছাকাছি অনুভব করেছিলেন। এই আত্মাদের জন্য তাঁরা রাতে খাবারের টেবিলে নির্দিষ্ট জায়গা করে, দরজার পাশে এবং রাস্তার পাশে খাবার রেখে দেন। আর প্রিয়জনকে আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যেতে সাহায্য করতেই মোমবাতি জ্বালানো হয়।

বর্তমানে হ্যালোইন ভূতগুলোকে প্রায়ই আরও ভয়ংকর এবং নৃশংস হিসেবে চিত্রিত করা হয়, এ ছাড়া এর কিছু রীতিনীতি রয়েছে, যেগুলো ভয়ংকর। এ সময় দুর্ভাগ্য নিয়ে আসার ভয়ে কালো বিড়ালকে এড়িয়ে চলা হয়। এ ধারণার ভিত্তি মূলত মধ্যযুগে, যখন অনেক লোক বিশ্বাস করতেন যে ডাইনিরা নিজেকে কালো বিড়ালে পরিণত করে, যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে।

হ্যালোইনে পাত্র-পাত্রী বাছাই

তবে হ্যালোইনের ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস সম্পর্কে আগের ধারণা আজকে অনেকেই ভুলে গেছে। কারণ, দেখা যাচ্ছে যে আজকাল হ্যালোইন উৎসবে অতীতের পরিবর্তে ভবিষ্যতের ওপর এবং মৃতের পরিবর্তে জীবিতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আয়োজন করা হচ্ছে।
বিশেষ করে, হ্যালোইনে অনেক তরুণীকেই তাঁদের ভবিষ্যৎ স্বামী বেছে নিতে সাহায্য করেছিল। তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তাঁরা একদিন আসবে ভাগ্য নিয়ে এবং পরের হ্যালোইনের মধ্যে তাঁদের বিয়ে হয়ে যাবে। আঠারো শতকে আয়ারল্যান্ডে একজন রাঁধুনি হ্যালোইনের রাতে সেদ্ধ করা আলুতে একটি আংটি পুঁতে রাখেন এ আশায়, এটি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া যাবে।

স্কটল্যান্ডে জ্যোতিষীরা সুপারিশ করেছিলেন, বিবাহযোগ্য তরুণীরা প্রত্যেকের জন্য একটি হ্যাজেলনাটের নাম রাখবেন এবং সেগুলো অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দেবেন। যেটি না ফুটে বা বিস্ফোরিত না হয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, ওই নামের ব্যক্তি তরুণীর ভবিষ্যতের স্বামী হবেন।

আরেকটি গল্পে বলা হয়েছে, হ্যালোইনের রাতে ঘুমানোর আগে যদি একজন তরুণী আখরোট, হ্যাজেলনাট ও জয়ফল দিয়ে তৈরি চিনিযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন, তাহলে তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ স্বামীর স্বপ্ন দেখবেন।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন