ইসলামি স্থাপত্যের জগতে মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক নিদর্শনও বটে। বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোতে একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। শুধু তাই নয়, এগুলোর নকশা, গম্বুজ, মিনার ও প্রাঙ্গণ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় ১০ মসজিদের একটি তালিকা করেছে দ্য ইসলামিক ইনফরমেশন সেন্টার। তালিকায় থাকা মসজিদগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বে দশম বৃহত্তম মসজিদ এটি। এর অবস্থান মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়াতে। এটি মালয়েশিয়ার বড় মসজিদগুলোর একটি। মসজিদে একসঙ্গে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন।
মালয়েশিয়ার রোজ-গ্রানাইট স্থাপত্যের এ নিদর্শনটিকে পুত্রাজায়া হ্রদের ওপর ভাসমানের মতো দেখায়।
পুত্রা মসজিদের ৩৭৭ ফুট উঁচু মিনার বাতিঘরের মতো কাজ করে, যা নৌকাকে পথ দেখায়। মালয়েশিয়ার রাজকীয় নকশা এবং পার্সিয়ান মুকার্নাসের সংমিশ্রণে মসজিদের মূল গম্বুজের নকশা করা হয়েছে।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম মসজিদ। এটি ইরানের বড় মসজিদগুলোর একটি। এর অবস্থান কোমে। মসজিদটিতে একসঙ্গে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন।
নীল টাইলসে তৈরি গম্বুজে কাশানের খনি থেকে আনা কোবাল্ট ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদে থাকা ১ হাজার ২০০টি রঙিন কাচের জানালা বর্ণিল আলো ছড়ায়।
মসজিদটি সম্প্রসারণের সময় এর ভূগর্ভে ৩০০ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। এটি পাশের পাহাড়ের নিচে চলে গেছে। কোমের ধুলো ঝড় থেকে রক্ষা করতে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা আছে। কমপ্লেক্সটি সপ্তাহে ৭ দিনই ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখানে ৮০০ জন স্বেচ্ছাসেবক পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
তালিকায় এ মসজিদের অবস্থান অষ্টম। এটি ভারতের বড় মসজিদগুলোর একটি। এর অবস্থান ভোপালে। মসজিদে একসঙ্গে ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন।
‘মসজিদের মুকুট’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এ মসজিদটি মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন।
মসজিদ সংলগ্ন দার-উল-উলুম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। মসজিদের ভূগর্ভে একটি আর্কাইভ রয়েছে। সেখানে মোগল যুগের ৩০ হাজার দলিল সংরক্ষিত আছে। রয়েছে সম্রাট শাহজাহানের ফরমানও।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম মসজিদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। এর অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায়। মসজিদে একসঙ্গে ২ লাখ মানুষ সমবেত হতে পারেন।
মসজিদটি ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। এতে ১৪৭ ফুট উঁচু গম্বুজ রয়েছে। আর এর মূল হলের আয়তন ৬ হাজার ৬৬৬ বর্গমিটার।
১০ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মসজিদ কমপ্লেক্সে একটি ১০ টন ওজনের বড় ঢোল (বেদুগ) রয়েছে। নামাজের সময় হলে এ ঢোল বাজিয়ে সংকেত দেওয়া হয়।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মসজিদ। তা ছাড়া এটি মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ। এটির অবস্থান কাজাখস্তানের আস্তানায়। গ্র্যান্ড মসজিদে একই সময়ে ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন।
মসজিদটি ২০২২ সালে উদ্বোধন করা হয়। এটি কাজাখস্তানের ইসলামি পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এর ৪৩৩ ফুট উঁচু নীল-সোনালি গম্বুজ ১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যায়।
নামাজের হলে ৭ হাজার বর্গমিটার বিস্তৃত কাজাখ উলের কার্পেট বিছানো। এ কার্পেট তৈরি করতে ৩০০ জন কারিগর দুই বছর সময় নিয়েছেন।
কমপ্লেক্সের মধ্যে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। সেখানে ২০০টি লেকচার হল রয়েছে।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম মসজিদ। এর অবস্থান পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। ফয়সাল মসজিদে একসঙ্গে ৩ লাখ মানুষ সমবেত হতে পারে।
সৌদি আরবের অর্থায়ন এবং তুর্কি নকশায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্যের এই নিদর্শনটি মরুভূমির বেদুইন তাঁবুর মতো দেখা যায়।
মূল নামাজ হলটি ৫৪ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। মসজিদের শব্দ প্রকৌশল এমনভাবে করা হয়েছে যে ইমামের কণ্ঠস্বর দেড় কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায়।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। এ মসজিদ ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। এর অবস্থান জেরুজালেমে। পুরো আল–আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের ধারণক্ষমতা ৪ লাখ।
কমপ্লেক্সে রয়েছে সোনালি গম্বুজবিশিষ্ট ইসলামি স্থাপত্য ডোম অব দ্য রক এবং রুপালি গম্বুজযুক্ত কিবলি মসজিদ।
মসজিদের নিচের সুড়ঙ্গগুলো ক্রুসেড যুগের ৩৭টি পানি সংরক্ষণাগারের সঙ্গে সংযুক্ত।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ। এর অবস্থান পাকিস্তানের করাচিতে। এ মসজিদের ধারণক্ষমতা ৮ লাখ।
মসজিদটি স্থাপত্যের দিক থেকে চমৎকার। এখানে অটোমান ঐশ্বর্য ও মোগল শিল্পকলা মিশে আছে। নদীর তীরে অবস্থিত ৭০ একর আয়তনের এ মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ১০৫ ফুট উঁচু। এটি হাতে বানানো ৮০ লাখ মোজাইক টাইলস দিয়ে সজ্জিত। নামাজের একটি হলে ৮৬টি ঝাড়বাতি আছে, যার মধ্যে ৬ লাখ ক্রিস্টাল ব্যবহার করা হয়েছে।
মসজিদের বেজমেন্টে ৪৫ বর্গমিটার বিস্তৃত একটি নামাজের জায়গা আছে, যা ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভিত্তির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। এর অবস্থান সৌদি আরবের মদিনায়। এ মসজিদটি ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। মসজিদে নববিতে একসঙ্গে ১৫ লাখ মানুষ সমবেত পারেন।
মসজিদে নববিতেই মহানবী (সা.)–এর পবিত্র রওজা শরিফ ও সবুজ গম্বুজের অবস্থান।
মসজিদের আন্ডারগ্রাউন্ডে তিন তলাবিশিষ্ট পার্কিং সুবিধা আছে। সেখানে ১২ হাজার গাড়ি রাখা যায় এবং সরাসরি মেট্রোর সংযোগও রয়েছে। মসজিদের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বিশেষ ছাতা স্থাপন করা হয়েছে। ছাতাগুলোর প্রতিটি ১ হাজার ৫০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এতে ফটোভোলটাইক সেল স্থাপিত আছে, যা সৌরশক্তি ব্যবহার করে মসজিদের মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে।
ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। এর অবস্থান সৌদি আরবের মক্কায়। পবিত্র মসজিদ আল–হারামে একসঙ্গে ৪০ লাখ মানুষ সমবেত হতে পারেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে মসজিদটির সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এটি এখন ১৫ লাখ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। নামাজ আদায়ের জন্য এখানে যে ১২টি তলা আছে সেগুলো এস্কেলেটর ও স্কাইওয়াকের (ওপর দিয়ে চলাচলের পথ) মাধ্যমে সংযুক্ত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে বেশ কিছু আধুনিক সুযোগ–সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। মার্বেল পাথরের মেঝের নিচে সৌরশক্তিচালিত এয়ারকন্ডিশনার স্থাপন করা হয়েছে, উন্মুক্ত স্থানে ছায়ার ব্যবস্থা করতে ১ হাজার ৫০০ ছাতা বসানো হয়ছে। শুধু তাই নয়, প্রচণ্ড ভিড়ের সময় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
পবিত্র কাবা শরিফের চারপাশে উন্মুক্ত জায়গায় (মাতাফ) ঘণ্টায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ তাওয়াফ করতে পারে।