পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আজ: কারা কখন দেখতে পাবেন, বাংলাদেশে কি দেখা যাবে

গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের আকাশে আংশিক সূর্যগ্রহণের সময় উড়ে যাচ্ছে একটি গাংচিল। ২৯ মার্চ ২০২৫ছবি: রয়টার্স

পশ্চিম ইউরোপের আকাশে আজ বুধবার দেখা যাবে বছরের সবচেয়ে আলোচিত মহাজাগতিক দৃশ্য—পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। ১৯৯৯ সালের পর এ প্রথম অঞ্চলটিতে এমন বিরল ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ।

চাঁদের প্রচ্ছায়া এবার উত্তর সাইবেরিয়া, আর্কটিক মহাসাগর এবং পূর্ব গ্রিনল্যান্ড পেরিয়ে পশ্চিম আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেনের ওপর দিয়ে যাবে। এরপর উত্তর-পূর্ব পর্তুগালের একটি ছোট অংশ ছুঁয়ে স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ও বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ মহাজাগতিক ঘটনা।

উল্লেখ্য, সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে আসে, তখন চাঁদের ছায়ার ঠিক কেন্দ্রভাগের ঘন অন্ধকার অংশটিই হলো প্রচ্ছায়া। পৃথিবীর যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে এ প্রচ্ছায়া অতিক্রম করে, সেখানকার মানুষই শুধু ‘পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ’ দেখতে পান।

আইসল্যান্ডের পশ্চিমে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর এবার সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব হবে সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় সময় আজ বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১৫টা ৪৮) আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক থেকে এ পূর্ণগ্রাস গ্রহণ স্পষ্ট দেখা যাবে।

আইসল্যান্ডের পশ্চিমে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর এবার সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব হবে সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় সময় আজ বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১৫টা ৪৮) আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক থেকে এ পূর্ণগ্রাস গ্রহণ স্পষ্ট দেখা যাবে।

অন্যদিকে স্পেনের উত্তরের শহর ‘আ করুনিয়া’ ও ‘বিলবাও’সহ কিছু এলাকায় সূর্যাস্তের ঠিক আগমুহূর্তে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ শুরু হবে। উত্তর-পশ্চিম স্পেনে স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৮টা ২৮ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ১৮টা ২৮) এ দৃশ্য তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনাসহ ইউরোপের বাকি বেশির ভাগ অঞ্চলের বাসিন্দারা আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন।

আরও পড়ুন

পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের পার্থক্য

পৃথিবী থেকে (চাঁদের) দূরত্ব অনুযায়ী আমাদের চোখে চাঁদের দৃশ্যমান বা আপাত আকারের তারতম্য ঘটে। আর এ আপাত আকারের ওপর ভিত্তি করে মূলত সূর্যগ্রহণ দুই ধরনের হতে পারে—পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস।

চাঁদ যখন পৃথিবীর খুব কাছে অবস্থান করে, তখন সেটিকে আকাশেও বেশ বড় দেখায় এবং এটি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে সক্ষম হয়। ফলে দিনের আলো নিমেষেই রূপ নেয় অন্ধকারে, তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায় এবং আকাশে উজ্জ্বল তারাগুলোও কখনো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

চাঁদ যখন সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখন তাকে পূর্ণগ্রাস বলা হয়। আর যখন সূর্যের চারপাশে একটি উজ্জ্বল আলোর বলয় দেখা যায়, তখন তাকে বলে বলয়গ্রাস বা ‘অ্যানুলার’ সূর্যগ্রহণ।

আগেই বলা হয়েছে, মূলত পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের ওপর এ তারতম্য নির্ভর করে। চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার না হয়ে ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার হওয়ায় আকাশেও এটির আকার কখনো কিছুটা বড়, আবার কখনো কিছুটা ছোট দেখায়।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ
ফাইল ছবি

চাঁদ যখন পৃথিবীর খুব কাছে অবস্থান করে, তখন সেটিকে আকাশেও বেশ বড় দেখায় এবং এটি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে সক্ষম হয়। ফলে দিনের আলো নিমেষেই রূপ নেয় অন্ধকারে, তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায় এবং আকাশে উজ্জ্বল তারাগুলোও কখনো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পূর্ণগ্রাসের এ কয়েক মিনিট সময়ে খালি চোখেই সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা ‘করোনা’ দেখার সুযোগ পান পর্যবেক্ষকেরা।

পূর্ণগ্রাসের এ সংকীর্ণ পথ বা ‘পাথ অব টোটিলিটি’র বাইরে উত্তর গোলার্ধের বিশাল এলাকাজুড়ে দেখা যাবে আংশিক সূর্যগ্রহণ। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালিসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের মানুষ সূর্যাস্তের আগে এ দৃশ্য উপভোগ করবেন। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকাতেও গভীর আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। উত্তর আমেরিকার ক্ষেত্রে কানাডার উত্তর ও পূর্ব অংশ, আলাস্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে আংশিক গ্রহণ দৃশ্যমান হবে।

তবে চোখের সুরক্ষার জন্য বিশেষ সৌর চশমা বা সোলার গ্লাস পরা বাধ্যতামূলক। কারণ, সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এ শতকের পরবর্তী সূর্যগ্রহণগুলো কখন, কোথায়

বিশ্বজুড়ে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে, ২০৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ও ২০৩৫ সালে জাপানে দেখা যাবে।

যুক্তরাজ্যে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে ২০৯০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সে ২০৮১ সালে এবং জার্মানিতে পরবর্তী শতাব্দী আসার আগে কোনো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার সম্ভাবনা নেই।

উত্তর আমেরিকায় আবার ২০৪৪ সালে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ফিরে আসবে। তখন চাঁদের ছায়া পশ্চিম কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম অংশের ওপর দিয়ে যাবে। পরের বছরই ২০৪৫ সালে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের এক উপকূল থেকে অন্য উপকূল পর্যন্ত পুরো দেশে আরেকটি সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হবে। তবে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় তখন সূর্যাস্তের সময় সূর্যগ্রহণ চলতে থাকবে।

যুক্তরাজ্যে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে ২০৯০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সে ২০৮১ সালে এবং জার্মানিতে পরবর্তী শতাব্দী আসার আগে কোনো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার সম্ভাবনা নেই।

রিং অব ফায়ার

চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকে, তখন সেটিকে সূর্যের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট দেখায়। এ অবস্থায় চাঁদ সূর্যের ঠিক মাঝখান দিয়ে গেলেও সেটি সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে এক উজ্জ্বল আলোর রিং বা আংটি দৃশ্যমান হয়, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিকুণ্ডলী বলা হয়ে থাকে। এ গ্রহণে আকাশ কিছুটা মলিন বা ধূসর হয়ে উঠলেও পুরোপুরি অন্ধকার হয় না।

২০২৬ সালের এ মহাজাগতিক ঘটনাটি স্পেনের আকাশে পরপর তিনটি সূর্যগ্রহণের প্রথম ধাপ। ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের ২ আগস্ট সেখানে আবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। সেই গ্রহণের পথ দক্ষিণ স্পেন পেরিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাবে। এরপর ২০২৮ সালের ২৬ জানুয়ারি স্পেনের আকাশে দেখা যাবে একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ।

স্পেনে ২০২৮ সালের এ ঘটনার পর আগামী বেশ কয়েক বছর ইউরোপের আর কোথাও কোনো বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। পরের বলয়গ্রাস গ্রহণগুলো ২০৩০-এর দশকে পর্যায়ক্রমে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশের ওপর দিয়ে যাবে।

বাংলাদেশে কি দেখা যাবে

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে এ মহাজাগতিক ঘটনা ঘটবে আজ রাতে। এর অর্থ হলো, ভারতের আকাশে কোনো সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না।

ভারতীয় প্রমাণ সময় অনুযায়ী ১২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১৩ আগস্টের প্রথম প্রহরের মধ্যে এ সূর্যগ্রহণ ঘটবে। নির্দিষ্ট করে বললে, ভারতীয় সময় রাত আনুমানিক ৯টা ৪ মিনিটে এ সূর্যগ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ১১টা ১৬ মিনিটে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সূর্যগ্রহণের এ সময় বিবেচনায় বাংলাদেশের কোথাও এ মহাজাগতিক দৃশ্য দেখা যাবে না।

ওই সময় ভারতজুড়ে সূর্য দিগন্তরেখার নিচে অবস্থান করবে। ফলে আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, দেশের কোনো অংশ থেকে এ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না।

তবে আকাশপ্রেমীরা মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএসহ প্রধান প্রধান মহাকাশ সংস্থাগুলোর সরাসরি অনলাইন সম্প্রচার দেখতে পারবেন।