default-image

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ক্রিস্টিন লির এমন দহরম–মহরম সম্পর্ক মাত্র তিন বছরেই আমূল বদলে গেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ লির নামে সতর্কতা জারি করেছে। গোয়েন্দা সতর্কতায় বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে চীনের হয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন লি। তিনি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এফবিআইয়ের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমআই৫ লির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেয়। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এভাবে কারও বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সতর্ক করার ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না।

ক্রিস্টিন লির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসে আরেকটি ঘটনায়। গত ১৩ জানুয়ারি সকালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিরাপত্তা পরিচালকের দপ্তরে ডাকা হয় লেবার পার্টির এমপি ব্যারি গার্ডিনারকে। সেখানে এমআই৫–এর কর্মকর্তারাও ছিলেন। ব্যারি জানান, লি তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত, বন্ধু। লির ছেলে তাঁর দপ্তরে চাকরি করেন। এমনকি লি তাঁর সেবামূলক কাজে পাঁচ লাখ পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন। এর পরপরই যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের স্পিকার ক্রিস্টিন লির বিষয়ে এমপিদের সতর্ক করে দেন।

চীনের কোন উৎস থেকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থায়ন করা হচ্ছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করতে পারেননি গোয়েন্দারা। এই বিষয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, অর্থের জোগান আসছে ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (ইউএফডব্লিউডি) থেকে। এটাকে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ‘গোপন একটি অস্ত্র’ বিবেচনা করা হয়।

ক্রিস্টিন লির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাঁকে সরাসরি চীনা গুপ্তচর বলেনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে বলা হয়েছে, লি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। প্রভাবশালী এমপিদের অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে নিজের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রবেশাধিকার পেয়েছেন।

১৩ জানুয়ারির ওই বৈঠক শুধু ক্রিস্টিন লির মুখোশ উন্মোচন করেনি। বরং যুক্তরাজ্য–চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি ও পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবার পথ তৈরি করেছে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি জুলাইয়ের শুরুতে লন্ডনে এমআই৫ ও এফবিআই চীনা হুমকির বিষয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করে দেয়। যদিও পাঁচ বছর আগেই সংবাদমাধ্যমগুলো লির অনুদানের বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল।

তবে চীনের কোন উৎস থেকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থায়ন করা হচ্ছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করতে পারেননি গোয়েন্দারা। এই বিষয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, অর্থের জোগান আসছে ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (ইউএফডব্লিউডি) থেকে। এটাকে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ‘গোপন একটি অস্ত্র’ বিবেচনা করা হয়। ৬ জুলাই দেওয়া বক্তব্যে এমআই৫–এর প্রধান কেন ম্যাককলাম ইউএফডব্লিউডির নাম উচ্চারণ করেছেন।

লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে চীনা প্রভাবের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। কিন্তু ক্রিস্টিন লি দেড় দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে সক্রিয় রয়েছেন। এত দিন গোয়েন্দারা কী করেছেন?
মার্টিন থরলে, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় যুক্ত

ক্রিস্টিন লির সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও যোগাযোগ নিয়ে বেশ চাপে পড়েছেন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক ব্যারি গার্ডিনার। অনেকেই তাঁকে ‘বেইজিং ব্যারি’ নামে ডাকছেন। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, যুক্তরাজ্যের সব কটি দলের রাজনীতিকদের মধ্যে নতুন একটি প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা করছে বেইজিং। যাঁরা হবেন চীনের প্রতি রাজনৈতিকভাবে সহানুভূতিশীল। এ জন্য বছরের পর বছর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন। অবাধে অর্থ খরচ করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন, চীন তাঁদের দেশের রাজনীতিকদের ওপর প্রভাব বিস্তারে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমআই৫–এর সাবেক প্রধান লর্ড ইভানস বলেন, সরকার ও গোয়েন্দারা এমন অনেক ঘটনা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন কাজ চিহ্নিতের পর আপনি এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন?

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দারা ক্রিস্টিন লির বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। কিন্তু পাননি। এমনকি তাঁকে চীনা গুপ্তচর হিসেবেও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তাই আপাতত লিকে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে প্রকাশ্যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

ক্রিস্টিন লি ১৯৭৪ সালে চীন থেকে যুক্তরাজ্যের বেলফাস্টে আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ১৯৯০ সালে লি উত্তর লন্ডনে তাঁর নিজের আইনি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। চীনা অভিবাসীদের আইনি সহায়তা দেয় তাঁর প্রতিষ্ঠান। ২০০৮ সালে লি যুক্তরাজ্যে চীনা দূতাবাসের আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। পরে বেইজিংয়ে ওভারসিজ চায়নিজ অ্যাফেয়ার্স অফিসে আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ২০১৮ সালে এই দপ্তর ইউএফডব্লিউডির অন্তর্ভুক্ত হয়।

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দারা গুরুতর অভিযোগ তোলার পরও ক্রিস্টিন লি এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। বিবিসির পক্ষ থেকে তাঁর মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি সাড়া দেননি।

যুক্তরাজ্যের গবেষক মার্টিন থরলে দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে চীনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘ক্রিস্টিন লির ভূমিকার বিষয়টি আমি পাঁচ বছর আগে থেকেই বলে আসছি। পরবর্তী সময়ে তাঁর (লি) চীনা সংযোগের বিষয়গুলো ক্রমেই প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ২০১৯ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গেও লির ছবি দেখা গেছে।’

মার্টিন থরলে আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্পে ভূমিকা রাখতে চায় চীন। এ ছাড়া হংকং ও তাইওয়ান নিয়ে লন্ডনের আগ্রহ ও ভূমিকার বিষয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ রয়েছে। মূলত এসব কারণে লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে চীনা প্রভাবের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। কিন্তু ক্রিস্টিন লি দেড় দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে সক্রিয়। এত দিন গোয়েন্দারা কী করেছেন?

বিবিসি ও গার্ডিয়ান অবলম্বনে

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন