এবারের ‘এল নিনো’ হতে পারে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র

এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারেফাইল ছবি: রয়টার্স

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রাকৃতিক ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার একটি নতুন ধাপ শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই চাপে থাকা পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) আজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিশ্বের একটি বড় অংশজুড়ে আরও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া বয়ে আনবে।

কয়েকটি দেশের আবহাওয়া সংস্থার বেশ কয়েকটি পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে, যাকে সম্ভাব্য ‘সুপার’ এল নিনো বলা হচ্ছে।

আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে ডব্লিউএমও বলেছে, এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি পর্যায়ক্রমিক উষ্ণায়ন, যা সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, মহাসাগরের উষ্ণ জলরাশি এল নিনো তৈরিতে ভূমিকা রাখছে এবং জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, এই এল নিনো আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘আমাদের একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যা খরা ও ভারী বৃষ্টিকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং স্থল ও মহাসাগর উভয় ক্ষেত্রেই তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে।’

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এর কারণে অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারে এবং মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।

এ আবহাওয়াবিন্যাস আঞ্চলিক জলবায়ুকে বিপর্যস্ত করার জন্য পরিচিত, যা বিশ্বজুড়ে উষ্ণ তাপমাত্রা বয়ে আনার পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, হর্ন অব আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এর কারণে অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারে এবং মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।

সাউলো আরও বলেন, ২০২৩-২৪ সালের সাম্প্রতিক এল নিনো ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়তে ভূমিকা রেখেছিল।

চৈত্রের খরতাপ থেকে রেহাই পেতে মাথায় গামছা জড়িয়ে সাইকেল চালাচ্ছেন চালকেরা। ছবিটি রাজশাহী রেলস্টেশন এলাকা থেকে তোলা। ৩ এপ্রিল
ছবি: শহীদুল ইসলাম, রাজশাহী

অসুস্থতা ও রোগব্যাধির প্রকোপ

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ইতিমধ্যে আমাদের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক জলবায়ু সংকটের একটি। একটি এল নিনো পরিস্থিতি এই হুমকিকে আরও তীব্র করতে পারে। ফলে তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি, পতঙ্গবাহী রোগের বিস্তার এবং খাদ্য ও পানিব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

সাউলো আরও বলেন, যেসব জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যে সংকটে রয়েছে, তারা আরও বেশি সীমার বাইরে চলে যাবে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে, যেখানে এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এল নিনো পরিস্থিতি তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

কিছু দেশের আবহাওয়া সংস্থা ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এশিয়াজুড়ে আরও গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে, যা ফসল ও খাদ্য সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সারসংকট ও জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে কৃষকেরা ইতিমধ্যে সংকটে রয়েছেন।

তবে ডব্লিউএমও বলেছে, এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, কিছু মডেল শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস দিচ্ছে না।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বের এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু–সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এল নিনো পরিস্থিতি উষ্ণ হতে থাকা বিশ্বে আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।