তৃতীয় ধাপের পরীক্ষাও সফল, ত্বকের ক্যানসার চিকিৎসায় আসছে টিকা

অধ্যাপক জর্জিনা লংছবি: মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

মারাত্মক ত্বকের ক্যানসার ‘মেলানোমা’র পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিশ্বে প্রথমবারের মতো তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক এমআরএনএ টিকার চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষায় বড় সাফল্য মিলেছে। অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পর প্রচলিত ওষুধের পাশাপাশি এই টিকা প্রয়োগে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি ও মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় অর্ধেক (৪২ শতাংশ) কমে যায়। আজ শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এ সাফল্যের ফলাও প্রচার করছে।

সিডনিভিত্তিক মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল ডিরেক্টর ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্জিনা লং এই ট্রায়ালে নেতৃত্ব দেন। ফলাফলকে ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানের জগতে এটি যেন চাঁদে পা রাখার মতোই এক মৌলিক পরিবর্তন।’

মোট ১ হাজার ১৩৭ রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের দুই বছর পর কেবল প্রচলিত ওষুধ পাওয়া রোগীদের ৭০ শতাংশ ক্যানসারমুক্ত ছিলেন। বিপরীতে টিকা ও ওষুধ দুটোই পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে। ওষুধ প্রস্তুতকারী মডার্না ও মার্কের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা এই এমআরএনএ টিকা তৈরি করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো আগাম প্রতিরোধক টিকা নয়; বরং আক্রান্ত ব্যক্তিদের অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার যাতে ফিরে না আসে, সে জন্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে প্রশিক্ষিত করে। স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেলে আগামী বছর থেকেই উচ্চঝুঁকিতে থাকা রোগীরা এই চিকিৎসা পেতে পারেন। ফুসফুস, স্তন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারেও প্রযুক্তিটির পরীক্ষা চলছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং ‘সিনা ল্যাব’-এর প্রধান গবেষক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ড. আবু সিনা এ অর্জনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। ১০ মিনিটে ক্যানসার শনাক্তকরণ পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত ড. সিনা জানান, করোনাভাইরাস টিকার সফলতার পর ক্যানসার চিকিৎসায় এমআরএনএ প্রযুক্তির প্রয়োগ গতি পায়।

ড. সিনা বলেন, ‘এই টিকা সরাসরি রোগ সারায় না; বরং শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলে, যাতে ক্যানসার কোষগুলোকে সহজে চিনে ধ্বংস করা যায়। অস্ত্রোপচার বা প্রচলিত থেরাপির পাশাপাশি এই টিকা ব্যবহার করলে ক্যানসার ফিরে আসার শঙ্কা দূর হয়।’

ড. সিনা আরও জানান, ভবিষ্যতের এই চিকিৎসা শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্যানসার রোগীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

তীব্র রোদের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় মেলানোমার প্রকোপ বেশি থাকায় স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও রোগটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সিডনিতে কড়া রোদের কারণে মেলানোমা নিয়ে সবাই শঙ্কায় থাকে। অস্ত্রোপচারের পরও ক্যানসার ফিরে আসার ভয় থাকে। এই টিকা সেই শঙ্কা অনেকটাই দূর করবে।’