ক্ষমতাসীন মহল যখন পুরোনো কায়দায় দেশ শাসনে ব্যর্থ হয় এবং দেশের মানুষ সাবেকি কায়দা মেনে নিতে অস্বীকার করে, তখনই সৃষ্টি হয় বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। শ্রীলঙ্কা, চিলি বা কলম্বিয়ায় ঠিক সেই রকম পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুত পরিবর্তন আসেনি। একই অবস্থা পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই। বিপ্লবের নামে ক্ষমতার হাতবদল হয় সত্যি, কিন্তু মানুষের ভাগ্য বদলায় না। ২০১১-১২ সালের ‘আরব বসন্তের’ কথা ভাবুন। অনেক আগেই সে বসন্ত গত হয়েছে, ক্ষমতার দণ্ড ছিনিয়ে নিয়েছেন হয় সামরিক কর্তা অথবা অন্য কোনো একনায়ক।

রাষ্ট্র ও বিপ্লব

আধুনিক বিপ্লবের প্রধান তাত্ত্বিক সোভিয়েত রাশিয়ার ভ্লাদিমির লেনিন। তাঁর চোখে, পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্ষমতাহীন ও শোষিত জনগণের নিষ্পেষণের হাতিয়ার। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকে প্রধানত পুঁজিবাদী শ্রেণি ও সরকারি আমলাদের ষড়যন্ত্রে। নিজেদের স্বার্থ জিইয়ে রাখতে এরা রাষ্ট্র নামক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে। এই রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে নিষ্পেষণের বিপুল উপাদান। পুলিশ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ ও তাঁবেদার তথ্যব্যবস্থা। পরিবর্তন অর্জন করতে হলে দরকার এসবের সমূল উৎপাটন।

বিশ শতকের দুই প্রধান ঘটনা, রুশ ও চীনা বিপ্লবের ফলে পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার নিষ্পেষণের হাতিয়ারসমূহ ঝেড়েমুছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ইরানের ইসলামি বিপ্লবেও সেই একই ঘটনা। সমস্যা হলো এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিষ্পেষণের পুরোনো হাতিয়ার উৎপাটন হতে না হতে নতুন নামে সেই একই হাতিয়ার ফের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় যুক্ত হয়। দুটো উদাহরণ নেওয়া যাক।

রাশিয়ায় জার আমলে বিপ্লববিরোধী প্রধান অস্ত্র ছিল গোপন পুলিশ। ওখরানা নামে পরিচিত সেই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল কঠোর হাতে বিপ্লবের যেকোনো চেষ্টা বানচাল করা। সেই ওখরানাকে পরাস্ত করে লেনিন যখন নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্রের পত্তন ঘটালেন, তাঁর প্রথম একটা কাজই ছিল নতুন এক ওখরানা প্রতিষ্ঠা। চেকা নামে পরিচিত সেই গোপন পুলিশ যে কাজ করত, তা ওখরানা থেকে আদৌ ভিন্ন ছিল না। ভিন্ন বোতল, একই তেল।

আধুনিক ইরানে, শাহের আমলে সব রাজনৈতিক প্রতিরোধ ঠেকাতে ব্যস্ত ছিল তার গোপন পুলিশ সাভাক। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত লেঠেল বাহিনী, বিদ্রোহের সামান্য আঁচ পেলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত। ইরানের ইসলামি বিপ্লব ছিল সেই সাভাকের বিরুদ্ধে এক প্রবল বিজয়। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় আসার পরপরই সাভাক বদলে আরেক সাভাক গঠন করলেন। সাভামা হয়ে উঠল সে দেশের নতুন শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী।

বিপ্লবের শুরু বৈষম্যের বিরুদ্ধে

প্রতিটি নাগরিক বিদ্রোহ, প্রতিটি গণ–আন্দোলন, প্রতিটি বিপ্লবের প্রধান কারণ বৈষম্য। আলোচনায় প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় লাতিন আমেরিকার দেশসমূহ থেকে উদাহরণ নেওয়া যাক। এই মহাদেশের বিশ শতকের ইতিহাস বৈপ্লবিক। বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, নিকারাগুয়া, পানামা, কার্যত মহাদেশের প্রায় প্রতিটি দেশেই আমরা দেখি ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণমানুষের বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান। কারণ, ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীনদের বৈষম্য, যার একটি হিসাব দিয়েছে মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ারস (জানুয়ারি ১৯৪৯)।

যেমন কলম্বিয়ার ৯০ শতাংশ জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৩ শতাংশ ভূস্বামী। আর্জেন্টিনায় মাত্র ১৫টি পরিবারের হাতে রাজধানী বুয়েনস এইরেসসহ দেশের অধিকাংশ আবাদি জমির মালিকানা। চিলিতে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে দেশের ৫২ শতাংশ জমি ও তার খনিজ সম্পদ। মেক্সিকোর মাত্র ১ শতাংশ ধনীর নিয়ন্ত্রণে দেশের ৭০ শতাংশ জমি ও খনিজ সম্পদ। একুশ শতকে এসেও সে অবস্থার লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

অর্থনৈতিক ক্ষমতা ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকার মানে দেশের সব রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের হাতে। এর ফলে যে অবিচার ও অসাম্য সৃষ্টি হয়, তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জাগবে সেটাই স্বাভাবিক।

বিপ্লব কেন ব্যর্থ হয়

১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁর চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইকে প্রশ্ন করেছিলেন, ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী? উত্তরে চৌ বলেছিলেন, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় এখনো আসেনি।

একই কথা অন্য সব বিপ্লব সম্পর্কে। প্রতিটি দেশের আলাদা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সে কারণে তাদের বিপ্লবের চরিত্রও স্বতন্ত্র। তবে মোটাদাগে কয়েকটি অনুষঙ্গের কথা বলা যায়। ক্ষমতাসীন মহলের বিরুদ্ধে লড়াই দেশের অধিকাংশ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।

কিন্তু ক্ষমতার হাতবদল হওয়ামাত্রই রাজনৈতিক ভিন্নতা ও স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিপ্লবী আন্দোলনকে বিভক্ত করে ফেলে। বিপ্লব মানেই রক্তপাত, ধ্বংস। কখনো কখনো এ রক্তপাতের ফলে আক্রান্ত নাগরিক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে দেখা দেয় প্রতিবিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবের কথা আমাদের জানা আছে, বল্গাহীন রক্তপাত সে বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে।

বিশ শতকের অধিকাংশ বিপ্লবেও আমরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভক্তির ফলে অন্তর্গত বিবাদ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ হতে দেখেছি। ‘আরব বসন্ত’ নাগরিক সুফল আনার বদলে সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়। বিদেশি হস্তক্ষেপ সে গৃহযুদ্ধকে কেবল দীর্ঘস্থায়ী হতেই সাহায্য করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার প্রতিবাদে আধা ডজনের মতো দেশে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। চিলি, কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, এমনকি মেক্সিকোতে যাঁরা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণভার নিয়েছেন, তাঁরা বিপ্লবী শুধু এই কারণে নয় যে মতাদর্শগতভাবে তাঁরা বামপন্থী। বরং যে রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন, তাতেই রয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা।

সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই বিজয়ী বিপ্লবীরা নিজেরাই নতুন ক্ষমতাধর শ্রেণি হয়ে ওঠেন। মানুষের ভাগ্য নয়, নিজেদের কায়েমি স্বার্থবাদ রক্ষাই তাঁদের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে তাঁদের অনেককে মত ও পথ বদলাতে হয়। রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁদের দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলে। ব্যর্থ হয় বিপ্লব।

নতুন শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার যে দেশগুলো আমাদের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুখবর দিয়েছিল, তারা প্রায় সবাই পিছু হটছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ বেহাল অর্থনীতি। কোভিড-উত্তর বিশ্বের প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ সে সংকটকে আরও তীব্র করেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব দেশে নতুন বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছিল, সেসবের অধিকাংশই অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে।

অদক্ষতার কারণেও এসব দেশে অসন্তোষ বাড়ছে। পেরুর কথা ধরুন। গত বছর জুলাইয়ে সাবেক স্কুলশিক্ষক ও শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা হোসে কাস্তিয়োর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন গভীর উৎসাহের সঞ্চার করেছিল। তিনি দরিদ্র জনতার প্রতিনিধি, দেশটির সাধারণ মানুষ আশা করেছিল তাঁর নেতৃত্বে সবার অবস্থা বদলাবে। এখন এক বছর পর, পেরুর সাধারণ মানুষ ফের রাস্তায় নেমেছে। তাদের উসকাচ্ছে পুরোনো কায়েমি স্বার্থবাদ।

শুধু অদক্ষতা নয়, কাস্তিয়োর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি দুবার অভিশংসনের মুখোমুখি হয়েছেন। দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৪০০-পাতার অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট কাস্তিয়ো ক্ষমতার আড়ালে একটি অপরাধ চক্র পরিচালনা করছেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কয়েক লাখ মানুষ রাজধানী লিমায় তাঁর পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

এ আলোচনার শুরুতে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনেছি। দীর্ঘদিন থেকে দেশটি রাজাপক্ষে পরিবারের হাতে জিম্মি, তাদের অদক্ষতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা শ্রীলঙ্কাকে ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রান্তসীমায় নিয়ে এসেছে। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ শুধু অর্থনৈতিক দুর্ভোগের বিরুদ্ধে নয়, রাজাপক্ষে পরিবারের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধেও।

কিন্তু সেই রাজাপক্ষেকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না, কারণ দেশের রাজনীতিতে এই পরিবারের প্রভাব এখনো অসীম। পেশাদার রাজনীতিকদের অনেকেই তাদের প্রতি অনুগত। অন্য বড় কারণ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিভক্তি ও উদ্দেশ্যহীনতা।

বিপ্লব ও ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’

অশান্ত ও অস্থির এক সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা চলেছি। শিল্পোন্নত ও অগ্রসর গণতন্ত্রের দেশসমূহও এ অস্থিরতার বাইরে নয়। যুক্তরাজ্যে দুই মাসে দুজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন এমন তীব্র হয়ে উঠেছে যে অনেকেই খোলামেলাভাবে গৃহযুদ্ধের কথা বলছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশসমূহ বিপুল সংকটে পড়েছে। ইতালি ও হাঙ্গেরিতে নব্য ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

ধ্রুপদি অর্থে যাকে আমরা বিপ্লব বলি, এ বিপন্ন সময়ে তার সম্ভাবনা কম। কার্ল মার্ক্স ও ভ্লাদিমির লেনিন ভেবেছিলেন শ্রমিক শ্রেণির হাতেই রচিত হবে পরবর্তী বিপ্লব। যে শ্রমিক শ্রেণি তাঁদের ভাবনায় ছিল, তার চরিত্র বদলে গেছে। এখন গতরখাটা শ্রমিক নয়, মগজ খাটানো শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের অনেকেই নিজেদের আর শ্রমিক ভাবেন না, পরিচালনা ব্যবস্থাপনার অংশ ভাবেন। সম্ভবত সে কারণেই আমাজনে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কোরীয়-জার্মান সমাজতাত্ত্বিক বাইয়ুং চুল-হান মনে করেন, আধুনিক পুঁজিবাদের একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা এ ব্যবস্থার শিকার, তারাই আর নিজেদের ততটা নির্যাতিত ভাবেন না। চুল-হানের কথায়, এটি আধুনিক পুঁজিবাদের সম্মোহনী চরিত্র। একসময় শ্রমিক শ্রেণির সামনে কে শত্রু কে মিত্র তা স্পষ্ট ছিল। এখন তা আর স্পষ্ট নয়। কাউকে এককভাবে বলা যাবে না এই আমার শত্রু। এই নতুন অর্থনীতিতে, ‘প্রত্যেকে মালিক, প্রত্যেকে চাকর।’

এ কথার অর্থ এই নয় বিপ্লবের দিন শেষ। যত দিন মানুষ শোষিত, সে বিদ্রোহ করবেই, তাকে আমরা বিপ্লব বলি আর না–ই বলি। বিখ্যাত জার্মান তাত্ত্বিক হানা আরেন্ড অর্ধশতাব্দী আগে বলেছিলেন, এখন পর্যন্ত বিপ্লবই মানব ইতিহাসের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও তার ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকবে। আজকের ইরানের দিকে তাকিয়ে সে কথার তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। বিপ্লবী অভ্যুত্থান সর্বদা সাফল্য পাক না পাক, সেই অভ্যুত্থানের আগুন থেকেই রূপ নেয় ভবিষ্যৎ, এ কথায় কোনো ভুল নেই।

১৭ নভেম্বর ২০২২, নিউইয়র্ক