দেশে দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা–১
যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বরাজনীতিতে নতুন ধারার জন্ম
বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোর জন্মের পেছনে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর আর সাহসী সংগ্রামের নানা গল্প। আমরা শুরু করছি সাত পর্বের একটি বিশেষ ধারাবাহিক, যেখানে সাতটি ভিন্ন দেশের স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে। আমাদের এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে আজ থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের কথা।
১৮২৬ সালে মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি চিঠিতে আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা থমাস জেফারসন লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৭৭৬ সালের ঘোষণাপত্রটি সারা বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
থমাস জেফারসনের এ কথা একটুও ভুল ছিল না। কারণ, এটি শুধু আমেরিকার জন্মের কোনো সাধারণ প্রমাণপত্র ছিল না, বরং পুরো বিশ্বরাজনীতিতে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছিল। এটি পরাধীন জাতিগুলোর জন্য স্বাধীন হওয়ার একটি দারুণ মডেলে পরিণত হয়। ইউরোপ, ক্যারিবিয়ান ও লাতিন আমেরিকার প্রায় ২০টি জাতি এই ঘোষণাপত্র দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে।
১৭৭৬ সালে গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি গোটা বিশ্বের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছিল। এটি পরাধীন জাতিগুলোর স্বাধীন হওয়ার একটি মডেলে পরিণত হয়। ইউরোপ, ক্যারিবিয়ান ও লাটিন আমেরিকার প্রায় ২০টি জাতি এই ঘোষণাপত্র দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে।
আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যে নিজস্ব স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রয়েছে, তার অনেকগুলোই আমেরিকার সেই আদি ঘোষণাপত্রের আদলে তৈরি। এটি উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ভেঙে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আইনি স্বীকৃতি আদায়ের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার এ ঘোষণার পেছনের ইতিহাস বুঝতে হলে সে সময়কার বিশ্বরাজনীতির দিকে একটু চোখ রাখতে হবে। তখন আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসনের অধীন ছিল। ব্রিটিশদের মাত্রাতিরিক্ত কর ও বৈষম্যমূলক নীতির কারণে আমেরিকানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৭৭৬ সালের ৭ জুন আমেরিকান কংগ্রেসে রিচার্ড হেনরি লি একটি প্রস্তাব আনেন। সেখানে তিনি উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি করার কথা বলেন।
আসলে তখন ব্রিটিশদের সঙ্গে আমেরিকার যে লড়াই চলছিল, তাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরের একটি বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ হিসেবেই দেখা হতো। নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, নিজেদের এই লড়াইকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে না পারলে ফ্রান্স বা স্পেনের মতো বড় দেশগুলোর সাহায্য পাওয়া যাবে না। বহির্বেশ্বের চোখে তারা শুধুই ব্রিটিশ রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা সাধারণ প্রজা হিসেবেই থেকে যাবে। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়াটা সে সময় ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছিল।
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সে সময়ের আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মকানুন খুব সতর্কভাবে মেনে চলা হয়েছিল। বিশেষ করে সুইস আইনবিদ এমের দে ভ্যাটেলের তত্ত্বগুলোকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী, একটি স্বাধীন দেশ বলতে এমন একটি রাষ্ট্রকে বোঝাত, যার ওপর অন্য কোনো বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ নেই এবং যে পৃথিবীর অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মতোই সমান আইনি অধিকার ভোগ করে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, জন অ্যাডামস বা থমাস জেফারসনের মতো নেতারা এই আন্তর্জাতিক রীতিনীতিগুলো মাথায় রেখেই একটি নতুন দেশ গড়ার পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক এই ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরি করার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তরুণ থমাস জেফারসনকে। এতে মূলত ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় জর্জের স্বৈরাচারী আচরণের লম্বা তালিকা এবং শেষে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের চূড়ান্ত ঘোষণা ছিল। একটি চমৎকার ব্যাপার হলো, জেফারসনের মূল খসড়ায় দাসপ্রথার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছিল এবং একে অমানবিক অপরাধ বলা হয়েছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক কারণে, বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার মতো রাজ্যগুলোর প্রবল চাপে চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র থেকে দাসপ্রথা বাতিলের সেই অংশটি পুরোপুরি বাদ দিতে হয়। এটি ছিল এই মহান দলিলের একটি বড় স্ববিরোধিতা।
এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ বা যুক্তরাষ্ট্র নামটি বিশ্বের সামনে উঠে আসে। ঘোষণাপত্রটি কেবল আমেরিকানদের জন্য লেখা হয়নি, বরং গোটা বিশ্বের মানুষের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়ে লেখা হয়েছিল। এর শেষ অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এখন থেকে তাদের যুদ্ধ ঘোষণা করা, শান্তি স্থাপন করা, চুক্তি করা এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো বাণিজ্য করার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে।
শুরুর দিকে এই দলিলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের দরবারে সমান মর্যাদার একটি দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। সেখানে ‘সকল মানুষ সমান’ বা জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের খোঁজের মতো ব্যক্তিগত মানবাধিকারের বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের দাবির কাছে কিছুটা আড়ালেই ছিল। তবে পরবর্তীকালে আব্রাহাম লিংকন ও ফ্রেডরিক ডগলাসের মতো নেতারা এই দলিলের মানবাধিকার ও সাম্যের নীতিগুলোকে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে ঘোষণাপত্রটির অর্থই যেন পাল্টে যায়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল না থেকে সবার মানবাধিকারের এক বিশ্বজনীন ইশতেহারে পরিণত হয়। এভাবেই এটি এমন এক আদর্শ তৈরি করেছিল, যা আজও বিশ্বের অসংখ্য পরাধীন জাতির স্বাধীনতার পথে আলোর মশাল হয়ে কাজ করছে।