ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখে মানুষ

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য অনুসারে, বিশ্বে ৮০ কোটির বেশি মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা এবং ৩২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ না খেয়ে মরার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে এবং বিশ্বের কম টিকা পেয়েছে, এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোভিড-১৯ আবার মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে।

অধিকন্তু, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়ে সংকটে আছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষ খরা, বন্যা, দাবানল, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখি।

গত এপ্রিলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আজকের বহুবিধ সংকটের সমপ্রবাহী হাওয়া প্রায় ১৭০ কোটি মানুষ অর্থাৎ মানবজাতির পাঁচ ভাগের এক ভাগকে এমন দারিদ্র্য ও ক্ষুধায় মুখে ফেলতে পারে, যা গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি।’

বর্তমানে ৭৩টি দরিদ্রতম দেশের অংশগ্রহণে ডিএসএসআইয়ের এই কমন ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়িয়ে আছে। তবে এই কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে এসব দেশের যোগ্যতার মানদণ্ড পর্যালোচনা এবং তা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

খাদ্য ও জ্বালানিতে জোর দিতে হবে

পরিস্থিতি বিপজ্জনক হলেও আমরা তার পরিবর্তন করতে একেবারে অক্ষম নই। ঋণ, জ্বালানি এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই কিছু বহুপক্ষীয় উদ্যোগ চালু করা হয়েছে। তবে সেসব উদ্যোগ কার্যকর করতে এ ধরনের প্রচেষ্টাকে সমন্বিত ও ব্যাপক মাত্রায় রূপ দিতে হবে। আমাদের সমস্যাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি এত বেশি সংযুক্ত যে এগুলোর টুকরো টুকরো সমাধান সম্ভব নয়।

এ মুহূর্তে যে বিষয়ের ওপর সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সেটি হচ্ছে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির ন্যায্যমূল্য এবং নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই বছর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ডব্লিউএফপির অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ করতে কমপক্ষে এক হাজার কোটি ডলার দরকার। এখন পর্যন্ত কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সরকার গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ফুড সিকিউরিটির (জিএএফএস) মতো কিছু উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছে। ৮০টির বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি কল টু অ্যাকশন’ শীর্ষক রোডম্যাপকে সমর্থন দিয়েছে। খাদ্যসংকট মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মন্ত্রিপর্যায়ে সংলাপ হয়েছে এবং গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে।

মজুত নয়, খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে

যদিও এ কথা সুবিদিত যে উন্মুক্ত বাণিজ্য খাদ্যসংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ২০টির বেশি দেশ খাদ্য রপ্তানির ওপর (রপ্তানি লাইসেন্স, কর বা সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে) বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

অবশ্য আশার কথা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্যদেশগুলো সম্প্রতি ডব্লিউএফপির মানবিক পণ্যসামগ্রী কেনাকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে কেবল এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক খাদ্যবাজার কীভাবে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করে এবং সরবরাহ ও মজুতের ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা রাখে, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

খাদ্যপণ্যের দাম কমাতে বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুতকারী দেশগুলোকে খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। স্বচ্ছতা ও নজরদারির উন্নয়ন এবং গুজব প্রতিরোধে কৃষিবাজার তথ্যব্যবস্থা (অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেট ইনফরমেশন সিস্টেম, সংক্ষেপে এএমআইএস) জোরদার করতে হবে। আমাদের অবশ্যই এটি নিশ্চিত করতে হবে যে আরও অধিকসংখ্যক দেশ যেন কৃষি আমদানি বহুমুখীকরণ এবং আরও স্থিতিস্থাপক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (যেখানে সম্ভব) মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে।

জ্বালানি পরিকল্পনা জরুরি

ইতালির প্রধানমন্ত্রী (সদ্য পদত্যাগী) মারিও দ্রাঘি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং অন্যরা তুলনামূলক কম দামে তেল কেনার জন্য একটি ‘কার্টেল’ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিব্যবস্থা ত্বরান্বিত ও জ্বালানি-দক্ষতা উন্নত করতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেক নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে তাঁরা আলোচনা করছেন। কিন্তু মিসরে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের (কপ-২৭) বিষয়ে আমাদের গতি বাড়াতে হবে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো আজকের খাদ্য, জ্বালানি এবং ঋণ সংকট মোকাবিলায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরও অনেক কিছু করতে পারে। সেটি তাদের করতেও হবে। আইএমএফের ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যালান্সশিটের মাত্র এক-চতুর্থাংশ অর্থ বর্তমান সংকটে সংগ্রামরত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা এবং ঋণসেবা ও অনুদান দেওয়ার জন্য রাখা আছে। আইএমএফের এই ঋণের পরিমাণ বাড়ানো উচিত।

একইভাবে বিশ্বব্যাংক সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একটি মূলধন পুনঃপূরণ আলোচনার মাধ্যমে এবং ঋণের গ্যারান্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে তার ট্রিপল-এ ক্রেডিট রেটিং সুবিধা ব্যবহার করে আরও ঋণ দিতে পারে।

ক্রমবর্ধমান ঋণ সংকট মোকাবিলায় আমাদের একটি শক্তিশালী আগাম বহুপক্ষীয় পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া এবং অস্থিতিশীল ঋণের বোঝায় নুইয়ে পড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুদান সহযোগিতার উদ্যোগ দরকার।

২০১৫ সাল থেকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ সংকট ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬০ শতাংশ হয়েছে।

অনেক মধ্যম আয়ের দেশের ক্রেডিট রেটিং নিম্নমুখী হচ্ছে, যার অর্থ হলো এসব দেশ উচ্চতর ঋণ-পরিষেবা ব্যয়ের সম্মুখীন হবে। বিশেষ করে এখন মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এবং অন্যান্য প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আর্থিক নীতি যেভাবে কঠোর করছে, তাতে মধ্যম আয়ের ঋণ পরিষেবা ব্যয় আরও বাড়তে থাকবে।

ঋণ সংকট মোকাবিলায় করণীয়

ঋণ সংকট কমাতে আরও বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মহামারির প্রথম দিকে চালু করা ডেট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ (ডিএসএসআই) ৪৮টি নিম্ন আয়ের দেশে মাত্র ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার অস্থায়ী ত্রাণ দেওয়ার পরে এটির মেয়াদ ও কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। অধিকন্তু, সংগঠনটি কেবল সরকারি দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের ঋণ দিয়েছিল। বেসরকারি ঋণদাতাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ উন্নয়নশীল দেশের ঋণের বৃহত্তম অংশ এই বেসরকারি ঋণদাতারাই দিয়ে থাকে।

ডিএসএসআই চালুর পর সংকটাপন্ন দেশগুলোর সার্বভৌম দেউলিয়া দশা কাটাতে এবং দীর্ঘায়িত তারল্যসংকট মোকাবিলায় ‘ঋণচিকিৎসা’র একটি কাঠামো বানানো হয়েছিল। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ থেকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশে করা হয়েছিল। ঋণগ্রহীতার ঋণের অপরিহার্য ব্যয় এবং তাদের পরিশোধ করার ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঋণ পুনর্গঠন করার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার দেড় বছরে মাত্র তিনটি দেশ (চাদ, ইথিওপিয়া ও জাম্বিয়া) এতে যুক্ত হয়েছে এবং তাদের কেউ–ই সফলভাবে ঋণ পুনর্গঠন করতে পারেনি।

ঋণের স্বচ্ছতা জরুরি

বর্তমানে ৭৩টি দরিদ্রতম দেশের অংশগ্রহণে ডিএসএসআইয়ের এই কমন ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়িয়ে আছে। তবে এই কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে এসব দেশের যোগ্যতার মানদণ্ড পর্যালোচনা এবং তা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চীনের মতো ঋণদাতা দেশ ও বেসরকারি খাতগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷

সার্বভৌম ঋণ নিয়ে পুনঃ আলোচনার জন্য বৃহত্তর ঋণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদিও এতে চীনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই এর নজির রয়েছে।

আইএমএফের সারচার্জ স্থগিত করতে হবে

সবশেষে আইএমএফের সারচার্জ (অত্যধিক ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য ধার্য করা অতিরিক্ত ফি) অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত। মহামারি শুরুর পর থেকে এ ধরনের বাড়তি খরচ বহনকারী দেশের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৯ থেকে বেড়ে ১৬-তে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের হিসাবমতে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩৮-এ পৌঁছাতে পারে।

আমরা এমন এক অভূতপূর্ব বহুবিধ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, যা আমাদের ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই হুমকি মোকাবিলায় জি-২০-কে আরও একবার সংকল্পবদ্ধ হয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে হবে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন