পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সড়ক কোথায় কোন দেশে

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো এমন সড়ক টিকে আছে, যেগুলো হাজার হাজার বছরের পুরোনো। এসব সড়ক প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস, সে সময়ের বাণিজ্য, সেনা অভিযান ও মানুষের চলাচলের ধরন সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা দেয়।

এসব সড়কের অধিকাংশই অসাধারণ প্রকৌশল দক্ষতার জ্বলন্ত নিদর্শন। প্রাচীন এসব সড়ক পাথরের টুকরা দিয়ে তৈরি, রয়েছে জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। নির্ভুল পরিকল্পনায় তৈরি হওয়ার ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এগুলো টিকে রয়েছে।

বাণিজ্যিক পথ থেকে প্রশাসনিক ও সামরিক চলাচল—এসব সড়ক এক একটি সাম্রাজ্য গঠনে, বাণিজ্য বৃদ্ধিতে এবং প্রাথমিক নগরকেন্দ্রগুলোকে সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে প্রাচীন সড়ক রয়েছে এমন ১০ দেশের একটি তালিকা করেছে ভ্যানগার্ড নিউজ। তার আলোকে সাজানো হয়েছে আজকের শীর্ষ ১০।

১০

যুক্তরাজ্য


ওয়াটলিং স্ট্রিট ও ফোস ওয়ের মতো রোমান আমলে তৈরি সড়কগুলো যুক্তরাজ্যে এখনো ব্যবহার হচ্ছে। এসব সড়ক প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো। স্তরে স্তরে পাথর ও কঙ্কর বিছিয়ে এই সড়কগুলো তৈরি করা হয়েছে। এ কারণেই সড়কগুলো হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এসব সড়ক গুরুত্বপূর্ণ রোমান বসতি ও সামরিক স্থাপনাকে সংযুক্ত করেছিল।

পেরু

পেরুর ইনকা রোড সিস্টেম (কাপাক নান) আন্দিজ পর্বতমালা ঘিরে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত একটি সড়ক নেটওয়ার্ক। প্রাক্‌-কলম্বীয় আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ সড়ক নেটওয়ার্কের একটি ছিল এটি।

পাথর দিয়ে তৈরি এই সড়ক প্রশাসনিক কেন্দ্র, ধর্মীয় অনুষ্ঠানস্থল এবং পাহাড়ি বসতিগুলো সংযুক্ত করেছিল। সড়কগুলো রুক্ষ, কঠিন ও পাথুরে ভূপ্রকৃতিতে চলাচল সহজ করেছিল।

এই সড়ক নেটওয়ার্কে সড়কের পাশাপাশি সিঁড়ি, সেতু ও জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল। এসব সড়ক ইনকা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও বাণিজ্যকে দারুণভাবে সহায়তা করত।

ইরাক

এখন পর্যন্ত হাতে থাকা তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে যেসব স্থানে একেবারে শুরুতে রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছিল, তার একটি মেসোপটেমিয়া। এই অঞ্চলটি বর্তমান ইরাকে অবস্থিত। ব্যাবিলন, উর ও নিনেভের মতো প্রধান শহরগুলো সড়কপথে সংযুক্ত ছিল, যা প্রাচীন আমলে বাণিজ্য, শাসন ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রাকে সহজ করেছিল।

ইরান

আকিমেনিড বা একমেনীয় সাম্রাজ্যের সময় তৈরি ‘রয়্যাল রোড’। এই সড়ক বরাবর প্রায় প্রতি ১৫ থেকে ২৫ মাইল অন্তর ‘চাপারখানেহ’ থাকত। সেখানে থাকত নতুন ঘোড়া, প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ এবং বার্তা বাহকদের থাকার ব্যবস্থা
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

আকিমেনিড বা একমেনীয় সাম্রাজ্যের সময় খ্রিষ্টপূর্ব ৫ শতকে ইরানের ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘রয়্যাল রোড’ তৈরি করা হয়েছিল। এই মহাসড়ক পূর্বে সারদিস থেকে পশ্চিমে সুশা অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি বাণিজ্য, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো।

ভারত

মানচিত্রে ভারতের উত্তর পথ (কালো রং) ও দক্ষিণ পথ (লাল রং)
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

উত্তর পথ, দক্ষিণ পথসহ প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন বাণিজ্যিক সড়কগুলো ওই অঞ্চলের শহরগুলো সংযুক্ত করত। প্রাচীন ভারতে এসব সড়ক ধরেই কাপড়, মূল্যবান রত্ন ও মসলা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যেত।

তুরস্ক

আধুনিক তুরস্কে এখনো রোমান ও বাইজেনটাইন যুগের মহাসড়কের অবশিষ্টাংশ দেখতে পাওয়া যায়। অঞ্চলটি এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল হওয়ায় ঐতিহাসিক এসব সড়ক দুই মহাদেশের বাণিজ্য, সামরিক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

এই অঞ্চলে ইফেসাস ও পেরগামন শহরে প্রাচীন আমলে তৈরি পাথুরে সড়ক ও জলনিষ্কাশন ব্যবস্থার দেখা মেলে। এসব ঐতিহাসিক সড়ক বর্তমান তুরস্কের বাণিজ্যিক পথ ও অবকাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

চীন

চীনের হংকংয়ে ২০১৬ সালে এশিয়ান ফিন্যান্সিয়াল ফোরামে চীনের সিল্ক রোডের মানচিত্র দেখানো হচ্ছে। প্রাচীন আমলে ওই অঞ্চলে তৈরি কয়েকটি সড়ক এই সিল্ক রোডে যুক্ত হয়েছে
ছবি: রয়টার্স

চীনে প্রাচীন রাজবংশের সময় থেকেই নানা সড়ক নির্মাণ করা শুরু হয়। ওই সব সড়কই পরে দেশটির সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। চীন, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নিশ্চিত করতে সিল্ক রোডের ভূমিকা অপরিহার্য।

গ্রিস

খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তৈরি লেখাইওন রোডের একাংশ। সড়কটি প্রাচীন করিন্থকে করিন্থ উপসাগরের লেখাইওন বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করত। এটি প্রাচীন গ্রিক এই শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে একটি
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

প্রাচীন গ্রিসে করিন্থ, স্পার্টা ও অ্যাথেন্সের মতো শহরগুলো সংযুক্ত করতে বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। এসব রাস্তা বাণিজ্য, সামরিক কার্যক্রম ও বৌদ্ধিক বিনিময়কে সহজ করেছিল।

সড়কগুলো ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তৈরি হতো। সাধারণত পাথরের টুকরা বিছিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হতো। গ্রিসের প্রাচীন সড়কগুলোর বেশ কয়েকটি বন্দর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল, যা প্রাচীন গ্রিসে ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য ছিল।

মিসর

একটি খনির কাছ থেকে আগ্নেয়শিলা নীল নদের সঙ্গে সংযুক্ত একটি হ্রদের তীরে নিয়ে যেতে ‘লেক ময়েরিস কোয়ারি রোড’ তৈরি করা হয়েছিল
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

বিশ্বের প্রাচীনতম সড়কগুলোর একটি লেক ময়েরিস কোয়ারি রোড। এটি প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পাথরে বাঁধা এই সড়ক ১৯৯৪ সালে খুঁজে পান। সড়কটি মিসরের ফাইজুম জেলায় অবস্থিত।

এই সড়ক খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে তৈরি। মিসরের প্রাচীন রাজত্বকালে সড়কটি তৈরি করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, একটি খনির কাছ থেকে আগ্নেয়শিলা নীল নদের সঙ্গে সংযুক্ত একটি হ্রদের তীরে নিয়ে যাওয়া।

ইতালি

ইতালির রাজধানী রোমে রোমান সাম্রাজ্যের আমলে তৈরি দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো সড়ক ‘ভিয়া আপপিয়া’ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। এটি রোমান আমলে তৈরি প্রথম মহাসড়ক
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইউরোপের দেশ ইতালিতে রয়েছে রোমান সাম্রাজ্যের আমলে তৈরি দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো রাস্তাঘাট। এর মধ্যে ভিয়া অ্যাপপিয়ার মতো সড়কের কিছু অংশ আজও টিকে আছে। নিখুঁত নকশায় একটার পর একটা পাথরের টুকরা বসিয়ে এসব সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সড়কে রয়েছে জলনিষ্কাশনের সুব্যবস্থা।