জাপানে টানা ১০ বছর শিশু জন্মের বার্ষিক হার কমছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রচারিত দেশটির সরকারের প্রাথমিক উপাত্তে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জাপানে মোট ৭ লাখ ৫ হাজার ৮০৯টি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। শিশু জন্মের এই সংখ্যা দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড সর্বনিম্ন। আনুপাতিক দিক থেকে এই হিসাব আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ কম। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সারা বছর জন্ম-মৃত্যুর পার্থক্য বিবেচনা করলে এই পতনকে স্বাভাবিক হ্রাস হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। ২০২৫ সালে জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান ছিল ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪৫। অর্থাৎ গত বছর শিশু জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ঠিক এই পরিমাণ বেশি ছিল।
জাপানের জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে দেশে ৭ লাখ ৭৪ হাজার শিশু জন্ম নিতে পারে। তবে আনুপাতিক সেই হিসাবের চেয়ে প্রায় ৭০ হাজার কম শিশু জন্ম নেওয়ায় সরকারের প্রকাশিত সর্বশেষ এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, দেশটির জনসংখ্যা–সংকট কতটা গভীর আকার নিতে শুরু করেছে।
জন্মহার ধারাবাহিকভাবে কমার পেছনে শিশু পরিচর্যা সুবিধার ঘাটতি এবং পারিবারিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকেরা। শিশু পরিচর্যার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় সদ্য বিবাহিত অনেক দম্পতি সন্তান নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। অধিকাংশ পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ে সংসারের খরচ মেটাতে হয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার অর্থ হলো, শিশুর ভরণপোষণের বাড়তি খরচ। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের বাইরে অতিরিক্ত ছুটি নিতে হওয়ায় পরিবারের মোট আয় কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ। জাপানে চাকরিজীবী নারীরা সন্তান জন্মের পর সাধারণত ছয় মাস ছুটি ভোগ করতে পারেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ সময় তাঁরা বেতনের ৫০ শতাংশ পেয়ে থাকেন। ছয় মাসের বেশি ছুটি নিতে হলে তা বিনা বেতনে নিতে হয়। অনেক পরিবার মনে করে, সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর প্রয়োজনীয় দেখাশোনা করার জন্য ছয় মাসের ছুটি পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে জাপান এখনো পুরোপুরি সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারায় এর চাপও পরিবারগুলোর ওপর পড়ছে। বিশেষ করে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দুর্বল অবস্থার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম অনেকটাই ঊর্ধ্বমুখী। জাপান খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। তাই ইয়েনের দাম কমে যাওয়ায় অনেক খাদ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে, যার ফলে মানুষের আয়ের সঙ্গে ক্রয়ক্ষমতার সামঞ্জস্য থাকছে না। এ কারণেই খাদ্যসামগ্রীর ওপর থেকে ভোগ্যপণ্য কর কমানোর দাবি উঠলেও সরকার এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও সদ্য সমাপ্ত নিম্নকক্ষ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন উদার গণতন্ত্রী দলসহ অন্য সব দলই এই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সন্তান জন্মদানে পরিবারগুলোকে উৎসাহিত করতে জাপান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখন পর্যন্ত তা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারছে না। আগামী অর্থবছরে সরকার সন্তানদের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে যাচ্ছে। এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরে প্রথম দুই সন্তানের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য মাসে ১৫ হাজার ইয়েন করে সহায়তা দেবে সরকার। তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে এই শিশু পরিচর্যা সহায়তা বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ হাজার ইয়েন।
তবে শিশু জন্মের সংখ্যা কমলেও কিছু ইতিবাচক দিকও লক্ষ করা গেছে। সর্বশেষ উপাত্তে জন্মসংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও কমার এই হার সংকুচিত হয়ে আসার প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন ২০২৪ সালে আগের বছরের তুলনায় শিশু জন্মের সংখ্যা কমেছিল ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মোট সংখ্যা এক বছর আগের চেয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক হিসাবে জাপানের ৪৭টি জেলার মধ্যে অধিকাংশ জেলায় শিশু জন্মের সংখ্যা কমলেও টোকিও মেট্রোপলিটন এলাকা এবং ইশিকাওয়া জেলায় তা বেড়েছে। টোকিওতে এই বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ। গত ৯ বছরের মধ্যে জাপানের রাজধানীতে প্রথমবারের মতো শিশু জন্মসংখ্যা বাড়ল।