মুসলিম ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেতে কোন ১০ গন্তব্যে বেশি যান পর্যটকেরা

ভ্রমণ মানে শুধু শারীরিকভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া নয়, এটি একই সঙ্গে অন্তরাত্মার যাত্রাও বটে। ভ্রমণকারীদের অনেকেই আছেন যাঁরা ঘুরতে যাওয়ার জন্য এমন গন্তব্য খুঁজে বেড়ান, যেখানে মিশে আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য। অনেকে নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে গন্তব্য বাছাই করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘মিডিয়াম’ বিশ্বে ইসলামি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ১০টি গন্তব্যের একটি তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় থাকা গন্তব্যগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

মক্কা

মক্কা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র নগরী বলে বিবেচিত
রয়টার্স ফাইল ছবি

ইসলামি ঐতিহ্যের গন্তব্যগুলোর তালিকা তৈরি করতে গেলে শুরুতেই আসে মক্কা নগরীর নাম। মক্কা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র নগরী হিসেবে বিবেচিত। এখানে রয়েছে পবিত্র কাবা শরিফের অবস্থান। মসজিদুল হারাম নামের পবিত্র মসজিদটির অবস্থানও এখানে। মক্কা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান। এটি মুসলিমদের পবিত্র হজের কেন্দ্রস্থলও। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার মক্কায় গিয়ে হজ পালন করার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আছে।

মদিনা

মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা
রয়টার্স ফাইল ছবি

মদিনা ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর। এখানে আছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নির্মিত মসজিদে নববি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারকের অবস্থানও এখানে। হজযাত্রার অংশ হিসেবে অনেক মানুষই মদিনায় ভ্রমণ করেন। এটি এমন মুসলিমদের জন্যও ভালো গন্তব্য, যাঁরা শান্তি খুঁজতে ও নবীর শিক্ষার সঙ্গে সংযোগ করতে চান। এটি এমন এক গন্তব্য, যেখানে মুসলিমরা আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা ও প্রিয় নবী (সা.)–এর শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারেন।

জেরুজালেম

পবিত্র আল–আকসা মসজিদ
রয়টার্স ফাইল ছবি

মক্কা ও মদিনার পর জেরুজালেম মুসলিমদের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। আরবিতে একে ডাকা হয় আল–কুদস নামে। জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে পবিত্র আল–আকসা মসজিদের অবস্থান। ইসলামি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ স্থান দেখতে চাওয়া মুসলিমদের জন্য এটি একটি অবশ্যদর্শনীয় স্থান। এ ছাড়া শহরটিতে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান ও স্মৃতিস্তম্ভ।

ইস্তাম্বুল

ইস্তাম্বুলের হায়া সোফিয়া মসজিদ
রয়টার্স ফাইল ছবি

ইসলামি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইস্তাম্বুল শহরটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। আয়া সোফিয়া মসজিদ যেন শহরটির বৈচিত্র্যময় ইতিহাস তুলে ধরছে। আয়া সোফিয়া শুরুতে গির্জা ছিল। পরে এটিকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়।

ইস্তাম্বুলে দর্শনীয় অন্যান্য স্থানের মধ্যে আছে ব্লু মসজিদ (সুলতান আহমেদ মসজিদ), টপকাপি প্যালেস ও গ্র্যান্ড বাজার। এ স্থানগুলো তুরস্কে ইসলামের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রতিফলিত করছে।

গ্রানাডা

ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে স্পেনের আলহামব্রা
এএফপি ফাইল ছবি

ভ্রমণের জন্য স্পেনের গ্রানাডা একটি চমৎকার গন্তব্য। মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য এটি বিশেষ একটি স্থান। এখানে আলহামব্রা নামের একটি সুন্দর প্রাসাদ ও দুর্গ আছে, যা স্পেনে মুরিশ প্রভাবের চিহ্ন বহন করছে। স্পেনে বহু শতাব্দী আগে ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসান হলেও গ্রানাডার স্থাপত্যে সেই সমৃদ্ধ ইতিহাসের ছাপ এখনো স্পষ্ট। আর তা শহরটিকে মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

কায়রো

কায়রোর আল–আজহার মসজিদ
রয়টার্স ফাইল ছবি

মিসরের রাজধানী কায়রো ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অমূল্য ভান্ডার। শহরের ঐতিহাসিক ‘ইসলামিক কায়রো’ এলাকায় গেলে দেখা যায়, ইসলামি সোনালি যুগের চিহ্ন বহনকারী মসজিদ, মাদ্রাসা ও প্রাচীন বাজার। আল-আজহার মসজিদ আর সালাহউদ্দিনের দুর্গও কায়রোর ইসলামি ঐতিহ্যকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করছে।

কুয়ালালামপুর

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর শহরটি যেন আধুনিকতা ও ইসলামি ঐতিহ্যের এক মিশ্রণ। শহরটি পেট্রোনাস টাওয়ার ও জামেক মসজিদের জন্য পরিচিত। এসব স্থান ইসলামি স্থাপত্যের নান্দনিকতাকে উপস্থাপন করে। মালয়েশিয়ার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে ইসলাম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আর এ কারণে এটি মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠেছে।

ফেজ

মরক্কোর প্রাচীন ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেজ শহর। এটি ইসলামের ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। ফেজের মদিনা ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান। এটি এমন একটি প্রাচীন জায়গা, যেখানে রয়েছে সরু গলি, জমজমাট বাজার ও অনেক পুরোনো মসজিদ।

আল–ক্বারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানও ফেজ শহরে। ইউনেসকো এটিকে এখনো চালু থাকা বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

দুবাই

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরটি বিশ্বের বিলাসিতা ও আধুনিকতার এক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে এখানেও ইসলামি মূল্যবোধের উপস্থিতি স্পষ্ট। শহরটিতে আছে জুমেইরাহ মসজিদ ও গ্র্যান্ড মসজিদের মতো দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা।

ইসলামিক স্থাপত্য আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের পাশে জ্বলজ্বল করে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে দুবাইয়ের প্রতিশ্রুতি মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য এটিকে এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

১০

বুরসা

তুরস্কের ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল বুরসা। এটি ইসলামি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ একটি শহর। এখানে অবস্থিত উলু জামে মসজিদ (গ্র্যান্ড মসজিদ) ও ইয়েসিল জামে মসজিদ (গ্রিন মসজিদ) ওসমানি স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন।

বুরসার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এটিকে মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। সেখানে গেলে ভ্রমণকারীরা একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক—দুই অভিজ্ঞতাই নিতে পারবেন।