এসেছে অমিক্রন, টিকা কত দূর?
অমিক্রন নিয়ে ডব্লিউএইচওর মুখ্য বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথান বলেছেন, অমিক্রন ধরনে করোনার টিকা কাজ করবে কি না, সেটি নিয়ে কথা বলার মতো সময় এখনো আসেনি।
করোনার নতুন ধরন (ভেরিয়েন্ট) অমিক্রন ইতিমধ্যে প্রায় ৪০টি দেশে ছড়িয়েছে। এ ধরন নিয়ে ভয়ের কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিজ্ঞানীরা বলছেন। ভয়ের কথা বলছেন অন্যরাও। আফ্রিকায় এ ধরন প্রথম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল এ নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এতে বলা হয়েছে, ডেলটা ও বেটা ধরনের তুলনায় অমিক্রনের পুনরায় সংক্রমিত করার ক্ষমতা তিন গুণ। এ ছাড়া আগে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা অমিক্রনের রয়েছে। ফলে টিকা বুস্টার ডোজ নিতে হবে কি না, আর এই ডোজ কত দিনে আসবে, এসব প্রশ্ন উঠছে।
এসব প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন টিকা তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। সব প্রতিষ্ঠানই বলছে, তারা নতুন ধরন নিয়ে কাজ করছে। অনেকে বলছে, তারা আত্মবিশ্বাসী, খুব শিগগির বাজারে টিকা আসবে।
ফাইজার-বায়োএনটেক
যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ফাইজার ও জার্মানির বায়োএনটেকের যৌথভাবে তৈরি টিকা ঠিক অমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ করবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠান দুটির পক্ষ থেকেও এমন কথা বলা হয়েছে। ইউরো নিউজের খবরে বলা হয়েছে, তাদের তৈরি দুই ডোজের টিকা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। বায়োএনটেকের সহপ্রতিষ্ঠাতা উগার শাহিন এ টিকা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছিলেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে। উগার শাহিন বলছেন, যাঁরা দুই কিংবা তিন ডোজ নিয়েছেন, অমিক্রন ঠেকাতে তাঁদের আরও টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হবে কি না, সে জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁরা পরীক্ষাগারের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাবেন।
অমিক্রন নিয়ে ডব্লিউএইচওর মুখ্য বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথান গত শুক্রবার বলেছেন, অমিক্রন ধরনে করোনার টিকা কাজ করবে কি না, সেটি নিয়ে কথা বলার মতো সময় এখনো আসেনি। আর ফাইজারের বিজ্ঞানীরা বলছেন, অমিক্রনের জন্য হয়তো টিকার গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে না।
এখন প্রশ্ন উঠছে, টিকায় যদি পরিবর্তন আনতেও হয়, তবে সেই জন্য কত দিন লাগবে? এর পরিপ্রেক্ষিতে ফাইজারের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ জন্য ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। আর এ পরিবর্তনের পর প্রথম ধাপের টিকা বাজারে আনতে ১০০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।
টিকার পাশাপাশি বড়ি নিয়েও সুখবর দিচ্ছে ফাইজার। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যালবার্ট বোরলা আশা করছেন, তাঁদের তৈরি বড়ি প্যাক্সলোভিডও অমিক্রনের বিরুদ্ধে কাজ করবে। কারণ, করোনাভাইরাসের জিন বিন্যাস অনেকবার পরিবর্তন হতে পারে, এমনটা মাথায় রেখে বড়িটি তৈরি করা হচ্ছে।
মডার্না
টিকা নিয়ে সংশয়ের কথা বলেছেন মডার্নার প্রধান নির্বাহী স্টিফান ব্যানসেল। কোনো রাখঢাক না রেখেই তিনি বলেছেন, আগের ধরনগুলোর বিরুদ্ধে মডার্নার টিকা যতটা কার্যকর, অমিক্রনের বিরুদ্ধে ততটা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
নতুন ধরন এবং বাজারে থাকা টিকা নিয়ে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যানসেল। তিনি বলেন, করোনার জিন বিন্যাস অনেকবার বদলে নতুন ধরনে রূপ পেয়েছে। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অমিক্রনের বিরুদ্ধে কার্যকর করতে হলে টিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। ফাইজারের মতো মডার্নার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। অমিক্রনের বিরুদ্ধে তাদের টিকা কতটা কার্যকর, সেটা জানতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগবে। ব্যানসেল বলেছেন, এরপর নতুন টিকা আনতে তাঁদের কয়েক মাসও সময় লাগতে পারে।
বর্তমান টিকা কেন কার্যকর না-ও হতে পারে, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্যানসেল। তিনি বলেন, মোট ৫০টি মিউটেশনের মধ্য দিয়ে করোনা নতুন রূপ পেয়েছে। আবার এসব মিউটেশনের মধ্যে স্পাইক প্রোটিনের মিউটেশন হয়েছে ৩২ বার। প্রচলিত টিকা তৈরি করা হয়েছে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য। টিকা যখন তৈরি করা হয়, তখন বিজ্ঞানীরা ভাবেননি যে এক কিংবা দুই বছরের মধ্যে এমন একটি ধরন আসতে পারে, যার এতবার মিউটেশন হয়েছে।
জনসন অ্যান্ড জনসন
অমিক্রন ধরন চিহ্নিত হওয়ার পর নিজেদের টিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছে জনসন অ্যান্ড জনসন। গত সোমবার তারা বিবৃতি দিয়েছে, অমিক্রন ধরন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ধরনের বিরুদ্ধে তাদের টিকা কার্যকর কি না, সেই পরীক্ষাও চলছে।
জনসন তাদের বুস্টার ডোজের পরীক্ষা চালাচ্ছে। যাদের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, তাদের রক্ত নিয়ে আরেকটি পরীক্ষা চালিয়ে দেখা হচ্ছে, বুস্টার ডোজ অমিক্রনের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর।
যদিও এই টিকা নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে। টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই টিকার প্রয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর টিকাটি আর ব্যবহার করেনি দেশটি। ফলে নতুন ধরন যখন ছড়াচ্ছে, তখন জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না।
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও কোভ্যাক্সিন
অমিক্রন ধরন চিহ্নিত হওয়ার পরই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি যে অমিক্রনের বিরুদ্ধে তাদের টিকা কার্যকর নয়।
কিন্তু টিকা কতটা কার্যকর, সেটাও এখনো জানা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যদি প্রয়োজন হয়, তবে তাদের টিকায় পরিবর্তন আনা হবে।
টিকা নিয়ে অক্সফোর্ডের আত্মবিশ্বাসের কারণ অবশ্য ভিন্ন। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, গত এক বছরে করোনার নতুন নতুন ধরন এসেছে। এসব ধরনের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দিয়েছে তাদের টিকা।
কিন্তু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যে বসে আছে, এমনটা নয়। টাইম ম্যাগাজিন বলছে, অমিক্রন ধরন পাওয়া গেছে, এমন দুই দেশ বতসোয়ানা ও ইসোয়াতিনিতে গবেষণা শুরু করেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে কথা বলেছেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের বিশেষজ্ঞ সমীরণ পদ্ম। তিনি বলেন, ভারতের উৎপাদিত ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্সিন ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ডের ক্ষেত্রে দুটি গবেষণা চালাতে হবে। এর একটি হলো পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে। অপরটি হলো জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণা।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা তৈরি করা হয়েছে অ্যাডেনোভাইরাস দিয়ে। এই ভাইরাস ক্ষতিকর নয়। এই টিকা নেওয়ার পর মানুষের শরীরের কোষে স্পাইক প্রোটিন তৈরি হয়, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে এবং মেমোরি সেল তৈরি করে, যা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
এ প্রসঙ্গে সমীরণ পদ্ম বলছেন, অমিক্রনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মডার্না কিংবা ফাইজারের টিকায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। তবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো টিকার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পরিবর্তিত অ্যান্টিজেনেও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রেও একই কথা বলেছেন তিনি।
ভারতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আদর পুনাওয়ালা বলেন, ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও তাঁদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা একটি নতুন টিকা নিয়ে আসতে পারি।’
সিনোভ্যাক ও সিনোফার্ম
চীনের যে দুই টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে, সেই দুটি সিনোভ্যাক ও সিনোফার্মের তৈরি। সিনোভ্যাকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অমিক্রনের কারণে যদি টিকায় পরিবর্তন আনতে হয়, সেই পরিবর্তন এনে দ্রুত টিকা তৈরি করতে পারবে তারা। টিকা উৎপাদন করা তাদের জন্য বড় কোনো বিষয় নয়।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, নতুন টিকাতেও সিনোভ্যাকের প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থা একই থাকবে। খুব দ্রুতই এ নিয়ে গবেষণা হবে। তারা গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এ জন্য অমিক্রনের নমুনাও সংগ্রহ করছে তারা। পূর্ববর্তী ধরন গামা ও ডেলটার জন্যও তারা টিকা তৈরি করেছিল। তবে টিকার মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন আনতে হয়নি।
টাইম ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, এই সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের তৈরি টিকা তুলনামূলক কম কার্যকর। যদিও এই দুই টিকা প্রয়োগে মৃত্যু কমানো সম্ভব হয়েছে চীন। কিন্তু এসব টিকা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য কম।
স্পুতনিক-ভি
রাশিয়ার তৈরি টিকা এটি। সবার আগে রাশিয়া এই টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েছিল। প্রয়োগও শুরু হয়েছিল। যদিও এই টিকা সম্পর্কে তথ্য খুবই সীমিত। নতুন ধরন অমিক্রন আসার পর রাশিয়া বলেছ, তাদের টিকা স্পুতনিক-ভি অমিক্রনের বিরুদ্ধে কার্যকর। এরপরও নতুন ধরন মাথায় রেখে বুস্টার ডোজ তৈরি করছে তারা। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বড় আকারে উৎপাদনে যেতে পারবে তারা।
ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা স্পুতনিকের অমিক্রন বুস্টার বাজারে ছাড়তে পারবে। আগামী বছর ৩০০ কোটি ডোজ বুস্টার সরবরাহ করতে পারবে তারা।
ঝুঁকি থেকেই যায়
অমিক্রন ঠেকাতে বুস্টার ডোজ যদি এসেও যায়, তারপরও ঝুঁকি থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এই নিয়ে মাঠপর্যায়ের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেলটার সংক্রমণ নিয়ে একটি গবেষণা করেছে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি। এতে বলা হয়েছে, ডেলটার বিরুদ্ধে মডার্নার টিকা ৫৬ শতাংশ কার্যকর। এই হিসাব প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া হিসাবের সঙ্গে মেলে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নতুন অমিক্রন ধরনের বিরুদ্ধে কতটুকু কাজ করবে টিকা?
বিজ্ঞানীরা আরেকটি কারণেও ঝুঁকির কথা বলছেন। সেটা হলো, টিকা আসতে আসতে সারা বিশ্বে অমিক্রন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। প্রশ্ন হলো, নতুন টিকা পাওয়ার আগেই যদি অমিক্রন জেঁকে বসে, তবে পরিস্থিতি কী হবে?