স্বাধীনতার মহানায়ককে যেভাবে স্মরণ করে ঘানাবাসী

ঘানার রাজধানী আক্রায় দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক কোয়ামে নকরুমাহ স্মৃতি উদ্যানের সামনে তাঁর ভাস্কর্য। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

কোয়ামে নকরুমাহর বিশাল ভাস্কর্যটির দিকে তাকাতে হলে চোখ তুলতে হয় আকাশের দিকে। যেন তিনি শুধু একটি দেশের নেতা নন, ইতিহাসেও অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্তত ঘানার মানুষের কাছে তো বটেই। হয়তো আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষের কাছেও।

গত ২৪ জুলাই ঘানার রাজধানী আক্রার কোয়ামে নকরুমাহ মেমোরিয়াল পার্ক অ্যান্ড মসোলিয়াম ঘুরে সেই অনুভূতিই সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এটি কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার সমাধি বা স্মৃতিস্তম্ভ নয়; এটি একটি জাতির জন্মের গল্প, স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস এবং একজন নেতাকে ঘিরে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী শ্রদ্ধার প্রতীক।

কোয়ামে নকরুমাহর সমাধি
ছবি: পার্থ শংকর সাহা

সাদা মার্বেল পাথরে গড়া পার্কটির চারপাশ সবুজে ঘেরা। মূল স্মৃতিস্তম্ভে পৌঁছানোর আগে কংক্রিটের সরু পথের দুই পাশে রয়েছে জলাধার। সেখানে সুরের তালে তালে নেচে ওঠে ঝরনার পানি। সেই পথ ধরে এগোতেই সামনে দেখা দেয় নকরুমাহর বিশাল ভাস্কর্য। মনে হয়, তিনি যেন এখনো সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে পথ দেখাচ্ছেন।

প্রত্যেক দর্শনার্থীর সঙ্গে একজন করে গাইড থাকেন। আমাদের গাইড ছিলেন অ্যাদজোয়দা ক্লানডি নামের এক তরুণী। তিনি ধৈর্য ধরে প্রতিটি নিদর্শনের ইতিহাস বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

স্বাধীনতারই আরেক নাম

নকরুমাহর জীবন যেন ঘানার স্বাধীনতারই আরেক নাম। ১৯০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ গোল্ড কোস্টের এনক্রোফুলে নকরুমাহর জন্ম। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। লিংকন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে গিয়ে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে দেশে ফিরে ইউনাইটেড গোল্ড কোস্ট কনভেনশনে যোগ দেন নকরুমাহ। পরে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কনভেনশন পিপলস পার্টি (সিপিপি)। তাঁর স্লোগান ছিল—‘সেলফ গভর্নমেন্ট নাউ’। স্বাধীনতার দাবিকে তিনি অপেক্ষার রাজনীতি থেকে জনগণের আন্দোলনে রূপ দেন।

কোয়ামে নকরুমাহর অমর বাণী। এটিও রয়েছে কোয়ামে নকরুমাহ মেমোরিয়াল পার্ক অ্যান্ড মসোলিয়ামে

১৯৫০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের কারণে নকরুমাহকে কারাবন্দী করা হয়। কিন্তু কারাগারে থাকতেই ১৯৫১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিপুল বিজয় লাভ করে। জনগণের চাপে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং তিনি সরকারের প্রধান হন।

এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৯৫৭ সালের ৬ মার্চ গোল্ড কোস্ট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নতুন নাম হয় ঘানা। সাব-সাহারা আফ্রিকার মধ্যে এটিই ছিল প্রথম দেশ, যা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। নকরুমাহ সেদিন বলেছিলেন, ‘ঘানার স্বাধীনতা অর্থহীন, যদি তা আফ্রিকার পূর্ণ মুক্তির সঙ্গে যুক্ত না হয়।’

নকরুমাহর এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় প্যান-আফ্রিকান ঐক্যের স্বপ্ন। ১৯৬৩ সালে অর্গানাইজেশন অব আফ্রিকান ইউনিটি প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে এ সংস্থাই আফ্রিকান ইউনিয়নে রূপ নেয়।

জাদুঘরের দেয়ালে সেই সব ইতিহাস

জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে সেই ইতিহাসের অসংখ্য আলোকচিত্র। স্বাধীনতার ঘোষণার সময়ের দুর্লভ ভিডিও, যা বিবিসি ধারণ করেছিল, আজও দর্শনার্থীদের দেখানো হয়। রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে নকরুমাহর সাক্ষাতের ছবি। সেখানে দেখা যায় প্যাট্রিস লুমুম্বা, সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রশ্চেভসহ অনেক বিশ্বনেতাকে। ইতিহাস যেন ছবির ফ্রেমে জীবন্ত হয়ে আছে।

জাদুঘরের প্রায় সব জায়গায় ছবি তোলা যায়। তবে একটি বড় কক্ষে নকরুমাহর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে ছবি বা ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ।

ঘরটি চারটি রঙে ভাগ করা। হলুদ অংশে নকরুমাহর শৈশব, লাল অংশে সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্থান, নীল অংশে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সময় এবং কমলা অংশে জীবনের শেষ অধ্যায়ের স্মৃতিচিহ্ন তুলে ধরা হয়েছে। বিন্যাসটি শুধু নান্দনিক নয়, দর্শনার্থীকে তাঁর জীবনের পথচলা অনুভব করায়।

তবে নকরুমাহর জীবন কেবল বিজয়ের ইতিহাস নয়। স্বাধীনতার পর তিনি দ্রুত শিল্পায়ন, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণও বাড়তে থাকে। ১৯৬৪ সালে ঘানাকে কার্যত একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। বিরোধীদের দমন এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক প্যাট্রিস লুমুম্বার সঙ্গে কোয়ামে নকরুমাহ। ছবিটি কোয়ামে নকরুমাহ মেমোরিয়াল পার্ক অ্যান্ড মসোলিয়ামে রয়েছে

১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নকরুমাহ রাষ্ট্রীয় সফরে ভিয়েতনাম ও চীনে থাকা অবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি। জীবনের শেষ সময় কাটে গিনিতে। ১৯৭২ সালের ২৭ এপ্রিল রোমানিয়ার বুখারেস্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

গাইড অ্যাদজোয়দা জানালেন, সামরিক সরকার একসময় নকরুমাহর স্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছিল; কিন্তু ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায়নি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯২ সালে এই স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়। প্রবাসে থাকা সমাধি দেশে আনা হয়। এ জাদুঘরেই শায়িত এখন এই সংগ্রামী, কাছেই আছে স্ত্রীর সমাধিও। আজ প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় এক হাজার মানুষ এটি দেখতে আসেন বলে জানালেন তিনি।

এই জাদুঘর দর্শনে সঙ্গে ছিলেন উগান্ডার দুজন পর্যটক এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা একজন দর্শনার্থী। সবার একই মন্তব্য—এই জাদুঘর না দেখলে ঘানা সফর অসম্পূর্ণ থেকে যেত।